অঘোষিত পরিবহন ধর্মঘট চলছে, আজও শেষ হচ্ছে না ভোগান্তি

6

ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশে অঘোষিত পরিবহন ধর্মঘট চলছে শুক্রবার সকাল থেকে। বৃহস্পতিবার পরিবহন খাতের মালিক-শ্রমিকদের একাধিক সংগঠন যাত্রী-পণ্যবাহী যান বন্ধ রাখার পক্ষে অবস্থান নেয়।

পরিবহন ধর্মঘটে শুক্রবার কার্যত পুরো দেশ থমকে যায়। হাজারো ভোগান্তি মাথায় চেপে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করেন যাত্রীরা। সড়কে রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য ছোট যানের ভাড়া বেড়ে যায় কয়েকগুণ। যানবাহন না পেয়ে অনেকে হেঁটেই গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দেন।

এদিকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাবেক নৌ-মন্ত্রী শাজাহান খান এমপি বলেছেন, দেশে পরিবহন ধর্মঘট চলছে না। ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় মালিকরা বাধ্য হয়ে গাড়ি চালানো বন্ধ রেখেছেন। এটাকে পরিবহন ধর্মঘট বলা যাবে না। আমরা সংগঠনের পক্ষ থেকে ধর্মঘট কর্মসূচি দিইনি। পরিবহন মালিকরা সড়কে গাড়ি নামাতে না চাইলে আমরা কী করব? চালকরাও অসহায়।

বুধবার ডিজেলের নতুন দাম ঘোষণার পরদিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার মালিকরা সাফ জানিয়ে দেন, অতিরিক্ত দামে ডিজেল কিনে পরিবহন চালানো সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে তারা পরিবহনের ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব দেন। মালিকদের সঙ্গে একমত হন শ্রমিক নেতারা।

ডিজেলের বাড়ানো দামের সঙ্গে বাসভাড়া সমন্বয়ের বিষয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) বরাবর চিঠি দেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে শুরুতে কোনো সাড়া দেয়নি বিআরটিএ। যদিও বৃহস্পতিবার সারাদিন ধরেই পরিবহন বন্ধ রাখা নিয়ে আলোচনা চলছিল মালিকপক্ষের মধ্যে। গণমাধ্যমেও এ সংক্রান্ত বিভিন্ন সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছিল।

সারাদিনের আলোচনা ও দুপুরের চিঠির পর রাত আটটার দিকে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের বিআরটিএর পক্ষ থেকে জানানো হয়, রোববার বেলা ১১টায় ভাড়া সমন্বয় সংক্রান্ত সভা হবে। সভাটি হবে বিআরটিএ সদর কার্যালয়ে। শুক্রবার ও শনিবার সাপ্তাহিক সরকারি ছুটি থাকায় সভাটি রোববার ডাকা হয়েছে বলে জানা গেছে।  এর মধ্যে শুক্রবার সারাদিন ভোগান্তিতে ছিলেন সাধারণ যাত্রীরা। অর্থাৎ কোনো সমাধান না এলে শনিবারও তাদের দুর্ভোগের মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে।

বিআরটিএর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা শুক্র ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি কাটানোর পর রোববার সমস্যা সমাধানের জন্য সভায় বসবেন। বিআরটিএ চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের মত নিয়েই রোববারের সভা ডাকা হয়েছে। সময় পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই।

সংশ্লিষ্ট ও সচেতনরা বলছেন, উদ্ভূত সমস্যার জরুরি সমাধানে দায়িত্বশীলদের উদ্যোগের অভাবে সড়কে পরিবহন ধর্মঘটের পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হচ্ছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, দ্রুত এ সমস্যা সমাধান করা উচিত ছিল।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় উদ্ভূত পরিস্থিতির সমাধান হচ্ছে না।  শনিবারও সারাদেশে বাস ও পণ্যবাহী যান চলাচল বন্ধ থাকবে। সাধারণ মানুষকে তার খেসারত দিতে হবে। রোববার সমস্যার সমাধান হলে সারাদেশে গাড়ি চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড সামসুল হকের মতে, দেশে যখন পরিবহন ধর্মঘটের মতো অবস্থা চলছে, তখন সমস্যা সমাধানের জন্য জরুরি উদ্যোগ প্রয়োজন। অতীতে এ ধরনের সমস্যা সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এবারও এ ধরনের সমস্যা সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। কালবিলম্ব করা হচ্ছে। তাতে সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

হঠাৎ এ ধরনের সংকটময় পরিস্থিতি তৈরি হলে তা দ্রুত সমাধানের জন্য ব্যবস্থাপনা থাকা জরুরি। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আরও দায়িত্বশীল হওয়ার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন এ বিশেষজ্ঞ।

বৃহস্পতিবার রাতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, পরিবহন মালিকরা গাড়ি চালাবেন না। সংগঠনের পক্ষ থেকে কোনো ঘোষণা না দিলেও গাড়ি বন্ধ থাকবে শুক্রবার সকাল ছয়টা থেকে। বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সাধারণ সম্পাদক রাকেশ ঘোষও কথা বলেন একই সুরে।

এর আগে, একইদিন দুপুরে বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান ও ট্যাংক লরি-প্রাইম মুভার মালিক শ্রমিক সমন্বয় পরিষদ ধর্মঘটের ডাক দেয়। সারা দেশের মালিকরা একযোগে শুক্রবার বাস ও পণ্যবাহী যান চলাচল বন্ধ রাখার ঘোষণা দেন। বৃহস্পতিবার চুপ থাকলেও শুক্রবার ভাড়া দিগুণ চেয়ে আল্টিমেটাম দেয় লঞ্চ মালিক সমিতি।

বুধবার জ্বালানি তেলের মূল্য ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৮০ টাকা নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন দেয় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। একইসঙ্গে বাড়ানো হয় কেরোসিনের দাম। ডিজেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা ও তা কার্যকরের পর থেকেই পরিবহন খাতে এর প্রভাব পড়তে থাকে।