আবারও এনবিআর সার্ভারে অনুপ্রবেশ, নজরদারিতে থাকা ১৫৩ টন পণ্য খালাস

42
Global business logistics import export background and container cargo freight ship transport concept

সাইবার অপরাধীরা আবারও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) উচ্চ সংবেদনশীল সার্ভারে অনুপ্রবেশ করে অন্তত ১৫৩ টন পণ্য খালাস করে নিয়েছে।

জাল আমদানি অনুমতিপত্র ব্যবহার করে নজরদারিতে থাকা এসব চালান খালাস করতে কাস্টমসের ২ কর্মকর্তার ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার হয়েছে। এসব পণ্য থেকে কোনো শুল্ক পায়নি সরকার। খালাসের আগে পরীক্ষা না হওয়ায় কি পরিমাণ শুল্ক ফাঁকি হয়েছে তা জানা সম্ভব হয়নি।

আগের মতোই এবারও প্রতারকরা ২ জন শুল্ক কর্মকর্তার লগইন এবং পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে অন্তত ৯টি চালান ছাড়িয়ে নেয়। এ বছরের জুন থেকে অক্টোবরের মধ্যে এই প্রতারণামূলক ঘটনাগুলো ঘটে।

অবৈধ পন্থা অবলম্বন করে ৯ জন আমদানিকারক একটি বড় আকারের শুল্ক ফাঁকি দিতে পেরেছে।

যে ২ জন কর্মকর্তার তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে, তাদের কারোই এই সিস্টেম ব্যবহার করার অনুমোদন ছিল না। একজনকে ঘটনার বেশ কয়েক মাস আগে অন্য জায়গায় বদলি করা হয়েছিল এবং অপরজনকে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। তবে এই ঘুষের অভিযোগের সঙ্গে অনুপ্রবেশের ঘটনার কোনো যোগসূত্র নেই।

তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে, উভয় কর্মকর্তা এর সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং অন্য ১টি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান , চতুর্থ প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান এবং বাকি ৫ আমদানিকারকের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

এই অবৈধ অনুপ্রবেশের ঘটনা সার্ভারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একবার সিস্টেমে অনুপ্রবেশ করতে পারলে সাইবার অপরাধীরা যেকোনো সংখ্যক চালানকে শুল্ক ছাড়া মুক্ত করার নির্দেশ দিতে পারে।

এনবিআরের সার্ভারে অবৈধ অনুপ্রবেশের এটি দ্বিতীয় ঘটনা। এই সিস্টেমটি ‘অটোমেটেড সিস্টেম ফর কাস্টমস ডাটা ওয়ার্ল্ড’ নামে পরিচিত।

এর আগে, ২০১৯ এ শুল্ক গোয়েন্দারা ২০১৬ থেকে ২০১৮ এর মধ্যে সার্ভারে অনুপ্রবেশের বেশ কিছু ঘটনা উন্মোচন করেন।

সে সময়, সাইবার অপরাধীরা অন্য ২ জন শুল্ক কর্মকর্তার লগইন ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে সিস্টেমে অনুপ্রবেশ করেন এবং ৩ হাজার ৩৩৭টি চালান শুল্ক ছাড়া মুক্ত করে দেন। পণ্যের মোট মূল্যমান ছিল ৮৫০ কোটি টাকা। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের (সিআইআইডি) একটি তদন্ত থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, সিস্টেমে অনুপ্রবেশ করার সময় ব্যবহৃত ইন্টারনেট প্রোটোকল (আইপি) অ্যাড্রেসগুলো শুল্ক বিভাগের নয়। এগুলো ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত, যেখানে ৭টি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও ২টি আমদানিকারকের অফিস রয়েছে।

এই ঘটনা নিয়ে ২টি মামলার বিচার কাজ ইতোমধ্যে চলমান রয়েছে। একটি মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং অন্যটি পুলিশ। দুদক এ ঘটনার সঙ্গে শুল্ক কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার অভিযোগ এনেছে এবং পুলিশ ৭ জন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও ২ জন আমদানিকারকের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ এনেছে।

২০১৯ সালের অনুপ্রবেশের ঘটনার পর শুল্ক কর্তৃপক্ষ কিছু ত্রুটি সারায় এবং আরও কঠোর লগইন তথ্য নিরীক্ষণ প্রক্রিয়া চালু করে। কর্তৃপক্ষ একই সঙ্গে কর্মকর্তারা বদলি হলে শিগগির তাদের লগইন স্থগিত করার জন্য নির্দেশনা দেয়।

তবে সর্বশেষে অনুপ্রবেশের ঘটনা থেকে দেখা গেছে উল্লিখিত ২ কর্মকর্তার লগইন চালু ছিল। এখনও এটি নিশ্চিত নয় যে, কারা এই লগইন ব্যবহার করেছেন এবং কোন জায়গা থেকে করেছেন।

অনিয়মের তথ্য পেয়ে শুল্ক কর্মকর্তারা ৯টি চালানকে ‘স্থগিত’ করে রেখেছিলেন। ‘স্থগিত’ থাকা চালানগুলোকে সশরীরে নিরীক্ষণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বন্দরের গুদাম থেকে চালান ছাড়ানোর আগে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়।

এনবিআরের সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট (আইটি) কাজী মুহাম্মদ জিয়াউল হক জানান, আইডির মালিকের সংশ্লিষ্টতা ছাড়া কেউ আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করতে পারার কথা না।

তিনি বলেন, ‘এমন কী এনবিআরের আইটি বিভাগও এই পাসওয়ার্ড জানতে পারে না। তবে আইডি এবং পাসওয়ার্ড পেলে দেশের যেকোনো অংশ থেকে যে কেউ এনবিআরের সার্ভারে প্রবেশ করতে পারবেন।’

এনবিআর ও শুল্ক কর্মকর্তারা জানান, সুনির্দিষ্টভাবে কী ঘটেছে এবং কীভাবে ঘটেছে, সে ব্যাপারে তারা এখনও তথ্য সংগ্রহ করছেন।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের ডেপুটি কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা এটা বের করার চেষ্টা করছি। আমরা আরও বিস্তারিত না জেনে কোনো মন্তব্য করতে পারছি না।

৯টি চালানকে শুল্ক না দিয়ে মুক্ত করার জন্য বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ জোন কর্তৃপক্ষের (বেপজা) নাম সম্বলিত ভুয়া ইমপোর্ট পারমিশন (আইপি) ব্যবহার করা হয়েছে।

শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক-মুক্ত সুবিধা পেয়ে থাকে। এই সুবিধা কাজে লাগাতে আমদানিকারকদের বেপজা থেকে পাওয়া আইপি জমা দিতে হয়।

শুল্ক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া নিজস্ব আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে শুধুমাত্র আমদানি সংক্রান্ত কাগজপত্র এনবিআরের সার্ভারে আপলোড করতে পারেন। আপলোড শেষ হওয়ার পর তারা কিছু পরিবর্তন করতে পারেন না এবং অন্য কোনো ফাইলেও তাদের প্রবেশাধিকার থাকে না।

শুল্ক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, কর্তৃপক্ষ শুরুতে ৯টি আমদানিকারকের ১১টি চালান অনিয়মের সন্দেহে চিহ্নিত করে। এর মধ্যে ৯টি চালান অবৈধভাবে খালাস করা হয় এবং শুল্ক কর্তৃপক্ষ বাকি ২টি চালান শেষ মুহূর্তে আটক করতে সমর্থ হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শুল্ক কর্মকর্তা বলেন, ‘ঘোষণা অনুযায়ী, ৯টি চালানে সুতা, ওভেন ফ্যাব্রিক এবং পলিয়েস্টার ফ্যাব্রিক ছিল। যেহেতু আমরা চালান পরীক্ষা করতে পারিনি, তাই এখন আমরা নিশ্চিত হয়ে বলতে পারছি না সেখানে কী ছিল। আমার মনে হয় না ঘোষণা অনুযায়ী পণ্য ছিল। কারণ ঠিক থাকলে কেউ ভুয়া ইমপোর্ট পারমিশন ব্যবহার করবে না। অবৈধ পণ্য ছিল বলেই জাল আইপি ও কর্মকর্তাদের আইডি ব্যবহার করা হয়েছিল।’

এই তদন্তের ব্যাপারে জানেন এমন এক কর্মকর্তা জানান, তারা এই ৯টি চালানের সংশ্লিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিও খুঁজে পাচ্ছেন না।

এই চালানগুলো চীন, হংকং ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে গত জুন থেকে অক্টোবরের মধ্যে এসেছে।

৮টি চালান ছাড়ানোর জন্য রাজস্ব কর্মকর্তা আমির হোসেনের আইডি এবং অন্যটির জন্য রাজস্ব কর্মকর্তা জয়নব বেগমের আইডি ব্যবহার করা হয়।

আমির হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষের উচিৎ ছিল বদলির পর কর্মকর্তাদের আইডি বাতিল করা। আমি জানি না তারা কেন এটি করেননি। এই প্রতারণার সঙ্গে আমার কোনো ধরণের সম্পৃক্ততা নেই।’

জয়নব জানান, তিনি তার আইডির অপব্যবহারের ব্যাপারে অবগত নন। তিনি বলেন, ‘আমার এই জালিয়াতি সম্পর্কে কোনো ধারনা নেই এবং আমি জানি না কীভাবে আমার আইডি ব্যবহার করা হয়েছে।’

সূত্র জানিয়েছে, ২৩ আগস্ট তার আইডি ব্যবহার করা হয়েছিল। সেদিন থেকে তার সাময়িক বরখাস্ত থাকার মেয়াদ শুরু হয়।

ঘোষণার নথি অনুযায়ী ৯টি আমদানিকারকের মধ্যে ৬টি ঢাকার ইপিজেডভিত্তিক এবং বাকি ৩টি ঈশ্বরদী ইপিজেডভিত্তিক।

ঢাকা ইপিজেডভিত্তিক অপর একটি আমদানিকারক টাইগারকো লিমিটেডের এক কর্মকর্তা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এই ৯ আমদানিকারকের প্রত্যেকেই সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট প্রত্যয় ইন্টারন্যাশনালকে তাদের পণ্যের চালান ছাড়ানোর দায়িত্ব দেয়।

এই প্রতিষ্ঠানের সত্ত্বাধিকারী মো. হাফিজুর রহমান জানান, তার ব্যবসা ঢাকাভিত্তিক এবং তিনি তার স্থানীয় এজেন্ট মোহাম্মদ মাসুদ ও ইমনের সাহায্য নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করেন। মাসুদ ও ইমন তার লাইসেন্স ভাড়া নিয়ে কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘তারা এর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।’

শুল্ক আইন অনুযায়ী লাইসেন্স ভাড়া দেওয়া অবৈধ।

মাসুদ ও ইমনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা একে অপর থেকে আলাদা ব্যবসা করছেন এবং পণ্য ছাড়ানোর সঙ্গে তারা জড়িত নয় বলে জানান।

শুল্ক কমিশনার ফখরুল আলম জানান, তিনি বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তিনি দৃঢ় সংকল্প।