এবার নিউমোনিয়ায় শিশুমৃত্যু বাড়তে পারে ১৬ লাখ

বিশ্ব নিউমোনিয়া দিবস

37

গত দুই দশকে, শিশুমৃত্যু হার কমেছে এবং দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যখাতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। তারপরেও দেশে প্রতিবছর ২৪ হাজার ৩শ জন শিশু নিউমোনিয়ায় মৃত্যুবরণ করে বলে এমন তথ্য দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

 

তারা বলছেন, করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) ও নিউমোনিয়া ভাইরাসের উপসর্গ একই রকম। বৈশ্বিক কোভিডের কারণেও শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে নিউমোনিয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। এমনকি এ বছর বিশ্বে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হয়েছে ৭৫ শতাংশের নিউমোনিয়ার কারণে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, সারাবিশ্বে করোনায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ার কারণে বিগত বছরের চেয়ে এবার ১৬ লাখ শিশুর মৃত্যু বাড়তে পারে।

ওই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিউমোনিয়া কেবলমাত্র একটি অসুখ নয়, নানামুখী শারীরিক জটিলতা থেকে এই রোগ হয়। আর তাই রোগের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান, পুষ্টিহীনতা হ্রাস এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়াজনিত মৃত্যুহার হ্রাস করা সম্ভব। নিউমোনিয়ার কারণে শিশুর ফুসফুসে পানি জমে যায়। এতে ফুসফুসের প্রদাহ সৃষ্টি হয় এবং কার্যক্ষমতা কমে যায়। নিউমোনিয়ার প্রভাবে সর্দি, জ্বর, বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এই সময় সংক্রমণ প্রতিরোধে মাস্ক ব্যবহার, নিরাপদ শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে চলা, হাত ধোয়াসহ রোগ নির্ণয়ের জন্য পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক অক্সিমিটারের পাশাপাশি শিশুদের টিকা নিশ্চিতে সরকারকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন।

শিশু বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. রুহুল আমিন বলেন, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে মৃত্যুহারের ১৮ শতাংশ নিউমোনিয়াজনিত মৃত্যু।

এই মৃত্যুহার কমিয়ে আনতে শিশুকে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শুধুমাত্র মায়ের দুধ খাওয়ানো এবং দুই বছর পর্যন্ত মায়ের দুধ খাওয়ানো চালিয়ে যাওয়া, ছয় মাসের পর থেকে মায়ের দুধের পাশাপাশি ঘরে বানানো পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো, পরিবেশ দূষণ হ্রাস করা এবং শ্বাসকষ্ট হলে তৎক্ষণাৎ নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন ডা. মো. রুহুল আমিন।

বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে ২০১৭ অনুযায়ী, ফুসফুসে সংক্রমণ দেখা দেওয়া পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে মাত্র ৪২ শতাংশকে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বা হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং মাত্র ৩৪ শতাংশ এন্টিবায়োটিক ওষুধ গ্রহণ করে।

বাংলাদেশ হেলথ ফ্যাসিলিটি সার্ভে ২০১৭ অনুযায়ী, নিউমোনিয়াজনিত শিশুমৃত্যুর ৪৫ শতাংশ ঘটে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। কেন্দ্রগুলোর চিকিৎসাজনিত অপ্রতুলতার একটি চিত্রও এ থেকে বোঝা যায়।

২০১৭ সালের অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে অনুযায়ী, বাংলাদেশের মাত্র ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিউমোনিয়ার পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা আছে।

ওই সমীক্ষায় আরও দেখা যায়, ৫০ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অক্সিজেন কনসেনট্রেট নেই। এক-তৃতীয়াংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অক্সিজেনের অন্যান্য সোর্সও অনুপস্থিত। মাত্র এক-তৃতীয়াংশ জেলা হাসপাতালে পালস অক্সিমিটার আছে।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের (আইসিডিডিআরবি) অ্যাসোসিয়েট সায়েন্টিস্ট ড. আহমেদ এহসানুর রহমান বলেন, দেশে ২০১১ সালে ইউনিয়ন নিউমোনিয়ায় ও পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি এক হাজার জীবিত জন্ম নেওয়া শিশুর মধ্যে ১১ দশমিক ১ শিশু মারা যেতো। এখন সেটি প্রতি হাজারে ৮ দশমিক ১। বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মধ্যে প্রতি এক হাজার জীবিত জন্ম নেওয়া শিশুর মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা তিনে নামিয়ে আনতে হবে।

তিনি বলেন, এই দেশে অভিভাবকদের মধ্যেও সন্তানকে চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আনার প্রবণতা দুর্বল, স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে সেবা নিশ্চিত করতে হলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে।

চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ডা. সমীর কুমার সাহা বলেন, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ৫০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে নিউমোনিয়ার কারণ জানা যায়নি। এই তথ্য ছাড়া ভবিষ্যতে নিউমোনিয়ার চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে যাবে। শিশু নিউমোনিয়া হ্রাসে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য সবার সম্মিলিতভাবে গুরুত্ব দিতে হবে।

ডা. সমীর বলেন, শুধু মৃত্যুহার নয়, কত সংখ্যক শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে সেই প্রকৃত সংখ্যা জানা গুরুত্বপূর্ণ।

ড. মোহাম্মদ জোবায়ের চিশতী বলেন, হাসপাতালে পালস অক্সিমিটার, স্বল্পমূল্যের দেশীয় অক্সিজেন স্বল্পতা দূর করতে হবে। প্রয়োজনে প্লাস্টিক বোতল দিয়ে তৈরি বাবল সিপ্যাপ নিউমোনিয়াজনিত শিশু মৃত্যুহার ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনতে সক্ষম।

তিনি বলেন, অপুষ্টির শিকার শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়াজনিত মৃত্যুর প্রবণতা ১৫ গুণ বেশি বলে গবেষণায় দেখা যায়।

বৃহস্পতিবার (১২ নভেম্বর) বিশ্ব নিউমোনিয়া দিবস,  এবারের প্রতিপাদ্য ‘নিউমোনিয়া চিকিৎসা অক্সিজেন নিশ্চিতের ব্যবস্থা বৃদ্ধি করুন। ’ এই দিবসটি উপলক্ষে বৃহস্পতিবার বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্থা দেশব্যাপী আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুভযাত্রাসহ নানা সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করবে।