গণবদলির আদেশ অযোগ্যতা-অদক্ষতার নজির

81

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম লেজেগোবরে অবস্থার দেখা যাচ্ছে। সারাদেশে করোনা মোকাবিলার জন্য জেলা ও উপজেলা প্রর্যায়ে হাসপাতালগুলোতে ১ হাজার ২৩৯ জন চিকিৎসকদের গণহারে বদলির আদেশ জারি করেছিল। কোভিড-১৯ অতিমারী মোকাবিলা এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য এই আদেশ জারি করা হয়েছিল। কিন্তু এই আদেশে মৃত ও অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসকরাও স্থান পায়। চিকিৎসকদের বদলির আদেশ স্বাস্থ্য মন্ত্রণায়ের অব্যবস্থাপনার আরেকটি নজির।

একদিকে অনিয়ম-দুর্নীতি, অন্যদিকে অযোগ্যতা-অদক্ষতায় দেশের স্বাস্থ্য খাত ডুবতে বসেছে। কিন্তু এ থেকে উত্তরণের কোন চেষ্টা বা আগ্রহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। অযোগ্যতা-অদক্ষতা দূর করে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার মাধ্যমে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এসব কর্মকান্ড পাল্টানো জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নইলে স্বাস্থ্য খাতের ভগ্নদশা দূর হবে না বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলেছেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের রুগ্নদশা চলছে দীর্ঘদিন ধরেই। মহামারীকালে সেই রুগ্নদশাই নানাভাবে নানা মাত্রায় ধরা পড়ছে। কখনও মাস্ক কেনায়, কখনও করোনার নমুনা পরীক্ষায় বিভিন্ন কেলেঙ্কারিতে মন্ত্রণালয়ের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পাচ্ছে। এমনকি এই মহামারীর সময় গত অর্থবছরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তাদের জন্য বরাদ্দ অর্থ ব্যবহার করতে পারেনি। আর এবার অদক্ষতা, অযোগ্যতার নজির মিললো চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে।

আজ বৃহস্পতিবার ( ৮ জুলাই) প্রশাসনের প্রানকেন্দ্র্র সচিবালয়ে গিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিবসহ কোন শীর্ষ কর্মকর্তা এ বিষয়ে কথা বলেননি বা বলতে চাননি।

তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের দেয়া এক সূত্রে জানা গেছে, গত ৪ ও ৫ জুলাই একযোগে এক হাজার ২৩৯ জন চিকিৎসককে দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সংযুক্তি দিয়ে বদলি ও পদায়নের আদেশ জারি করেছিল। একযোগে এত চিকিৎসককে বদলি ও পদায়নের উদ্দেশ্য হিসেবে আদেশে বলা হয়েছে ‘কোভিড-১৯ অতিমারী মোকাবিলা এবং জনসেবা নিশ্চিত করা’।

দেশে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দিন দিন বাড়ছে। কোভিড-১৯ রোগে মৃত্যু ও আক্রান্তের হারে নতুন নতুন রেকর্ড দেখতে হচ্ছে। সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর সংক্রমণ পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। করোনায় আক্রান্তদের চিকিৎসা সেবা দিতে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলো হিমশিম খাচ্ছে। উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসার অবস্থা আরও করুণ। চিকিৎসকদের বদলি ও পদায়নের ফলে এসব হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত রোগীদের সেবার মান বাড়বে-এমন ভাবনা থেকেই ওই আদেশ জারি করা হয়।

চিকিৎসকদের বদলি ও পদায়নের মতো সাধারণ কাজ করার যোগ্যতা এবং দক্ষতাও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিদের আছে কিনা সেই প্রশ্ন উঠেছে। কারণ ওই আদেশে একাধিক মৃত চিকিৎসকের নাম ছিল। অবসরে গেছেন বা চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন এমন চিকিৎসকের নামও স্থান পেয়েছিল সেই তালিকায়। বদলি করা হয়েছিল আরটি-পিসিআর ল্যাবের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসকদের। সেই বদলির যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দেয়। সমালোচনার মুখে তড়িঘড়ি করে বদলির আদেশ স্থগিত করা হয়। পরে সেটা সংশোধন করা হয়। তালিকা থেকে মৃত, অবসরপ্রাপ্ত এবং চাকরি ছেড়ে দেয়া ব্যক্তিদের নাম বাদ দেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এসব কর্মকান্ডের কারণে দেশের স্বাস্থ্য সেবা মারাত্নকভাবে বিঘ্ন হচ্ছে।

জানা গেছে, উপসচিব জাকিয়া পারভিনের স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘কোভিড-১৯ অতিমারী মোকাবিলা এবং জনসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরর্বর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত’ বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারের এই কর্মকর্তাদের ‘সংযুক্তিতে পদায়ন’ করা হলো। সংযুক্তিতে বদলি করা এই চিকৎসকরা পূর্ববর্তী বা মূল প্রতিষ্ঠান থেকেই বেতন-ভাতা প্রাপ্য হবেন বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়।

আজ বৃহস্পতিবার সচিবালে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার জন্য সকাল ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত পিএস এ রুমে বসে থেকেও তার স্বাক্ষাৎ পাওয়া যায় না। তবে তিনি ( মন্ত্রী) অফিস থেকে বেড় হওয়া যাওয়ার সময় পিছন থেকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি হাটতে হাটতে বলেন, দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে করোনা রোগী বাড়তে থাকায় হাসপাতালে চিকিৎসকরা হিমশিম খাচ্ছেন। এ কারণে করোনাকালীন সংকট থেকে উত্তরণের জন্য মেডিকেল কলেজগুলো থেকে চিকিৎসকদের হাসপাতালগুলোতে সংযুক্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, করোনারকালীন সংকট কেটে গেলে তারা আবার পূর্বের কর্মস্থলে ফিরে যাবেন। এটাকে বদলি বলা যায় না। তাদের হাসপাতালগুলোতে সংযুক্ত করা হয়েছে। এ কথা বলতে বলতেই তিনি সচিবালয় থেকে বেড় হয়ে যান।

প্রজ্ঞাপন সূত্রে জানা যায়, কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ থেকে কুষ্টিয়া জেলা হাসপাতালে বদলি করা হয়েছে ২৩ জন চিকিৎসককে। পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ থেকে পটুয়াখালী জেলা হাসপাতালে বদলি ও পদায়ন করা হয় ১৩ জন চিকিৎসককে। বান্দরবান মেডিকেল কলেজ থেকে ১৬ জন চিকিৎসককে বান্দরবান জেলা হাসপাতালে বদলি ও পদায়ন করা হয়েছে।

ফরিদপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল কলেজ থেকে শরীয়তপুর জেলা হাসপাতালে বদলি করা হয়েছে ২৭ জন চিকিৎসককে। আর ওই কলেজ থেকে একই কলেজের হাসপাতালে অর্থাৎ ফরিদপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিভিন্ন পদে সংযুক্ত দেয়া হয়েছে আরও ৩৬ জনকে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১৮ জন চিকিৎসককে খাগড়াছড়ি জেলা হাসপাতালে, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ থেকে ২২ জন চিকিৎসককে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা হাসপাতালে, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ থেকে আরও ২১ জন চিকিৎসককে নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে বদলি করা হয়েছে। চাঁদপুরের আবদুল মালেক উকিল মেডিকেল কলেজ থেকে চাঁদপুর জেলা হাসপাতালে বদলি করা হয়েছে ২২ জনকে।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ থেকে কুমিল্লা জেনারেল হাসপতালে বদলি করা হয়েছে ২৫ জনকে এবং একই প্রজ্ঞাপনে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ থেকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বদলি করা হয়েছে আরও ৩৬ জনকে।

সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ থেকে সাতক্ষীরা জেলা হাসপাতালে পদায়ন করা হয়েছে ১৬ জন চিকিৎসককে। কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ থেকে কক্সবাজার জেলা হাসপাতালে এবং রামু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলি করা হয়েছে ৪৮ জন চিকিৎসককে।

মাগুরা মেডিকেল কলেজ থেকে মাগুরা সদর হাসপাতালে ১৪ জন, নওগাঁ মেডিকেল কলেজ থেকে নওগাঁ জেলা হাসপাতালে ১৪ জন, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও রাজশাহী ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হেলথ টেকনোলজি থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট আধুনিক সরদ হাসপাতালে ২২ জন ও পাবনা মেডিকেল কলেজ থেকে পাবনা ২৫০ বেড জেনারেল হাসপাতালে ১৮ জনকে বদলি করা হয়েছে।

দিনাজপুর এম আবদুর রহমান মেডিকেল কলেজ থেকে ঠাকুরগাঁও জেলা হাসপাতালে ১৮ জন এবং পঞ্চগড় জেলা হাসপাতালে ১৮ জনকে পদায়ন করা হয়েছে। রংপুর মেডিকেল কলেজ থেকে গাইবান্ধা জেলা হাসপাতালে ১৭ জন, কুড়িগ্রাম জেলা হাসপাতালে ২৪ জন এবং লালমনিরহাট জেলা হাসপাতালে ২০ জনকে পদায়ন করা হয়েছে। এছাড়া নীলফামারী মেডিকেল কলেজ থেকে নীলফামারী জেলা হাসপাতালে ১১ জনকে পদায়ন করা হয়েছে।

খুলনা মেডিকেল কলেজ থেকে খুলনা জেলা হাসপাতালে এবং খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বদলি করা হয়েছে ২৮ জন চিকিৎসককে। খুলনা মেডিকেল কলেজ এবং বাগেরহাট মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট স্কুল থেকে ১৪ জনকে বাগেরহাট সদর হাসপাতালে পদায়ন করা হয়েছে।

কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ থেকে মেহেরপুর জেলা হাসপাতালে ১৫ জন, ঝিনাইদহ ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হেলথ টেকনোলজি ও কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ থেকে ঝিনাইদহ জেলা হাসপাতালে ১৫ জন। নোয়াখালীর আবদুল মালেক উকিল মেডিকেল কলেজ থেকে লক্ষ্মীপুর জেলা হাসপাতালে ১৯ জন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে ফেনী জেলা হাসপাতাল ও দাগনভূইয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৪ জন, রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজ থেকে রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালে ১৮ জন, আবদুল মালেক উকিল মেডিকেল কলেজ থেকে নোয়াখালী জেলা হাসপাতালে ২৮ জন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফরমেশন ডিসিজেজ (ডিআইডিআইডি) ফটিকছড়ি উপেজলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১১৪ জনকে পদায়ন করা হয়েছে।

যশোর মেডিকেল কলেজ থেকে চুয়াডাঙ্গা জেলা হাসপাতালে ১৪ জন, ঝালকাঠি মেডিকেল কলেজ থেকে ঝালকাঠি জেলা হাসপাতালে ২০ জন, বরিশালের শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ থেকে পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে ২০ জন, শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ থেকে ও বরিশাল জেলা হাসপাতালে ৫১ জন, পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ থেকে বরগুনা জেলা হাসপাতালে ১২ জন, পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ থেকে ভোলা জেলা হাসপাতালে ১২ জনকে বদলি করা হয়েছে।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ থেকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০২ জন, সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ, শহীদ এম মনমুর আলী মেডিকেল কলেজ এবং সিরাজগঞ্জ মেডিকেল অ্যাসিসটেন্ট ট্রেনিং স্কুল থেকে সিরাজগঞ্জ ২৫০ বেড বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালে ২০ জন, বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ থেকে জয়পুরহাট জেলা হাসপাতাল ও জয়পুরহাটের কালাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২১ জন, শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ ও বগুড়া ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি থেকে বগুড়া ২৫০ বেড মোহাম্মদ আলী জেলা হাসপাতালে ৪৩ জন এবং পাবনা মেডিকেল কলেজ ও শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ থেকে নাটোর জেলা হাসপাতালে ১৫ জনকে বদলি করা হয়।