জলরাশিতে ডুবসাতার ও আমরা

88

বর্ষায় টয়টুম্বুর নীল জলরাশিতে সাতার কাটতে, ডুব দিতে কত যে ভাল লাগে; তা কেবল তারাই অনুধাবন করবেন, যারা কংক্রিটের শহর ঢাকায় থাকতে থাকতে দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম। তাদের একটু প্রশান্তি দিতেই জয়বাংলানিউজের আজকের ভ্রমন গল্প।

বাংলাদেশের অনেক প্রান্তেই আপনি চাইলে যেতে পারেন জলরাশির ছোঁয়া পেতে। তবে করোনা মহামারিতে যারা অল্প খরচে রাজধানীর কাছাকাছি থেকেই এ সুবাস নিতে চান তাদের জন্য উত্তম জায়গা হতে পারে হাওর-বাওরের দেশ কিশোরগঞ্জ।

দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি মাঝে ৩৫ কিলোমিটার পিচঢালা অলওয়েদার রোড হাওরের বুক চিরে দুভাগ করে এগিয়ে যাওয়া মিঠামইনের কথা। সঙ্গে বন্ধন তৈরি করা ইটনা ও অষ্টগ্রামের অপরুপ সৌন্দর্য। ঢাকা এতো কাছাকাছি আর কী চাই?

হাওরের উত্তাল ঢেউয়ের দোল খেতে খেতে নৌকায় চড়লে ভুলে যাবেন জীবনের যাবতীয় কষ্ট। স্বভাবত, এখানে ভ্রমণে প্রতিদিনই ভিড় করেন হাজারো পর্যটক। নিকলীর বুকে পিচঢালা পথে আর হাওর ভ্রমণ করে রূপকথার গল্প বুনেন পর্যটকরা। তবে সড়কটি পর্যটকদের কাছে ভ্রমণ-বিলাসের উপকরণ মনে হলেও স্থানীয়দের জন্য আর্শীবাদ। ‘বর্ষাকলে নাউ শুকনাকালে পাও’ – স্থানীয়দের মধ্যে যুগ যুগ ধরে চলা এই প্রবাদকে হাওরের জলে ডুবিয়ে দিয়েছে এই সড়ক। সড়কটি হাওরের প্রাণভোমরায় পরিণত হয়েছে।

ইটনা-মিঠামইন ও অষ্টগ্রামে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার পাকা সড়ক। এই সড়কে ভ্রমণ বিলাসে প্রতিদিন মেতে থাকেন পর্যটকরা। সড়কটি যেন উত্তাল জলের ওপর দিয়ে কালো মসৃণ কার্পেট বিছিয়ে দিয়েছে কেউ।

সড়কটি কিশোরগঞ্জের তিন হাওর উপজেলা ইটনা-মিঠামইন ও অষ্টগ্রামকে এক করেছে। সারা বছরজুড়েই এ রাস্তায় চলাচল করা যাচ্ছে। রাস্তাটি হাওরের চেহারাই বদলে দিয়েছে। ঢাকার অতি কাছে এটিই এখন পর্যটকদের মূল আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় সড়কটির ছবিতে সয়লাব। নেটিজেনদের অনেকের প্রোফাইলে শোভিত হচ্ছে এই সড়ক। ভ্রমণভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপে শেয়ার হচ্ছে নানা কায়দায় তোলা সড়কটির ছবি। কেউ কেউ সড়কটির ফাঁকে ফাঁকে স্থাপিত মনকাড়া সেতুগুলোয় দাঁড়িয়ে সেলফি নিয়ে নিজেদের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে পোস্ট করছেন।

সেকারণে আমরাও ১২২ হাওরের দেশ কিশোরগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলাম। আমরা বলতে, আমার দুই মা-মনি(ফুফু) ফুফাতো চার ভাই-বোন, সেজ চাচ্চু ও ফুফা। দশজনের টিম আমাদের। ঢাকার এয়ারপোর্ট রেলস্টেশন থেকে প্রায় সকাল ৮টার আমাদের ট্রেন ছাড়লো। দুপুরের খানিক আগেই গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম। পরে নিকলীর জলে পা ছোঁয়াই। ভাষাহীন অনুভূতির প্রশান্তি ছুঁয়ে যায় হৃদয়ে। হাওরটাকে তখন সাগর মনে হল।

ইঞ্জিনচালিত নৌকায় চড়েই রওনা দিই মিঠামইনের উদ্দেশে। নৌকাতেই উপভোগ করি হাওরের মাছের অমৃত স্বাদ। আড়াই ঘণ্টার ভ্রমণ শেষে নৌকা নোঙর পোতে মিঠামইনের ইসলামপুরে। সেখান থেকে অটোচালিত রিকশায় চেপে ১৫-২০ মিনিট যেতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল চেনা সব ছবি। অনেকের টাইমলাইনে ঘুরঘুর করছিল যেসব ছবি।

সত্যি অসাধারণ সব দৃশ্য। কথিত আছে, তাজমহল দেখে যাওয়া পর্যটকরা একেকভাবে এর সৌন্দর্য প্রকাশ করেন। শুনেছি, সকালের নরম তুলতুলে রোদের শুভ্র তাজমহল থেকে দুপুর বেলায় জ্বলজ্বলে আলো ঠিকরে পড়ে। বিকেলের মন্দা আলোয় যে তাজমহল দেখা যায় তার সঙ্গে সকাল-দুপুরের দৃশ্যকে কেউ মেলাতে পারে না। তবে আমরা যখন গেলাম, তখন মেঘলা আকাশ। সেটার অনুভূতি ঠিক লিখে বোঝাতে পারছি না।
স্থানীয়রা বলেন, মিঠামাইনে সকালের নীল জলরাশি দুপুরে হলুদ বর্ণ ধারণ করে। রাতের পূর্ণিমায় সেই জলরাশি থেকে আঁকাবাঁকা রূপালি নুপুরের প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে। আর পিচ ঢালা পথ তাতে ঢেলে দেয় সৌন্দর্যের অমিয় সুধা।

যদিও আমরা সেটি দেখতে পাইনি মেঘলা আকাশের কারণে। তাছাড়া সুদর্শিনী হাওরের কোথাও রাতযাপনের সুব্যবস্থা নেই। ফলে একটু দুরে এসে রাতে হোটেলে উঠলাম। হোটেলে যখন বিশ্রাম নিচ্ছি তখনই নামল অঝোরে বৃষ্টি। সঙ্গে বজ্রপাত, তাই আর বাইরের দৃশ্য দেখা হয়নি। তবুও এমন সীমাবদ্ধতা আর করোনাকালকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে হাজারো পর্যটকদের ঢল নেমেছিল হাওরে! ছুটির দিনে নাকি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খায় পুলিশরা।

সকালের নাস্তা খেয়ে ফের একটু ঘোরাঘুরি করে বিকেলের ট্রেন ধরলাম ঢাকা উদ্দেশ্যে। তবে মন ভরেনি। পিছন ফিরে তাকাইওনি। যদি কষ্ট হয়। কী আর করার! ঘানিকের এ ট্যুর কিছুটা হলে সস্তি দিয়েছিল আমাদের। সিলেটের রাতারকুলে মতো সান্নিধ্যও যে পেয়েছিলাম এখানে।

সুতরাং, যে কেউ পরিবার নিয়ে অল্প টাকায় বড় বিনোদন পেতে চাইলে আজই ঘুরে আসতে পারেন হাওর-বাওরের দেশ কিশোরগঞ্জ।