তরুণ জয়ের দৃঢ়তায় দ্বিতীয় দিন বাংলাদেশের

39

নিউজিল্যান্ড সফরে যাওয়ার পর থেকেই সবার মধ্যে একপ্রকার দুর্ভাবনা ছিল, কেমন করবে বাংলাদেশ দল? আপাতত প্রথম টেস্টের প্রথম দুই দিন শেষে স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে, সমানে সমান লড়ছে মুমিনুল হক বাহিনী। বিশেষ করে দ্বিতীয় দিন পুরোটাই নিজের করে নিয়েছে তারা।

দিনের শুরুতে বোলারদের দুর্দান্ত প্রদর্শনী আর শেষে নাজমুল হাসান শান্তর সঙ্গে তরুণ মাহমুদুল হাসান জয়ের দৃঢ়তাপূর্ণ ব্যাটিং। যার সুবাদে আজকের তিন সেশন পুরোটাই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় দিন শেষে তাদের সংগ্রহ ২ উইকেটে ১৭৫ রান।

প্রথম দিন ৫ উইকেটে ২৫৮ রান করে আজকের খেলা শুরু করেছিল নিউজিল্যান্ড। দিনের ২০.৪ ওভারে আর ৭০ রান করতেই বাকি ৫ উইকেট হারায় তারা। জবাব দিতে নেমে দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষে আর ১৫৩ রানে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ দল, হাতে রয়েছে ৮ উইকেট।

নতুন বছরে বাংলাদেশের প্রথম ফিফটি করেছেন নাজমুল শান্ত। তবে শেষ পর্যন্ত থাকতে পারেননি তিনি। তিনি ব্যক্তিগত ৬৪ রানে আউট হলে ভাঙে জয়ের সঙ্গে গড়া ১০৪ রানের দ্বিতীয় উইকেট জুটি। এরপর দিনের বাকি অংশ কাটিয়ে দিয়েছেন অধিনায়ক মুমিনুল হক ও তরুণ জয়।

ক্যারিয়ারের মাত্র দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নেমে নিজের তৃতীয় ইনিংসেই অর্ধশতক তুলে নিয়েছেন জয়। টিম সাউদি, ট্রেন্ট বোল্ট, কাইল জেমিসন, নেইল ওয়াগনারের তোপ সামলে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে উইকেটে থেকে ২১১ বল খেলে ৭০ রানে অপরাজিত রয়েছেন তিনি। মুমিনুলের নামের পাশে রয়েছে ৮ রান।

সাম্প্রতিক সময়ে নিউজিল্যান্ডে খেলতে গেলে সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ থাকে ওয়াগনারের একের পর এক বুক বরাবর আসা বাউন্সার। সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম, সৌম্য সরকাররা তার বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণের পথকেই বেছে নিয়েছিলেন আগের সফরগুলোতে।

তবে জয় হেঁটেছেন ভিন্ন পথে। ওয়াগনারের বাউন্সারে আক্রমণাত্মক খেলার বদলে সোজা ব্যাটে ডিফেন্স করে গেছেন প্রায় পুরোটা সময়। বিশেষ করে শান্ত সাজঘরে ফেরার পর শেষ বিকেলে ওয়াগনারের ১৮ বল খেলে ১ রান করেছেন জয়।

শুধু ওয়াগনার নয়, নিউজিল্যান্ডের অন্যান্য বোলারদের বিপক্ষে চরম ধৈর্য্যের পরিচয় দিয়েছেন এ ২১ বছর বয়সী ডানহাতি ব্যাটার। জেমিসনের রাইজিং ডেলিভারি কিংবা বোল্ট-সাউদির সুইং, দারুণভাবে মোকাবিলা করে পুরো ৬৭ ওভারে উইকেটে কাটিয়ে দিয়েছেন তিনি।

যার সুবাদে বাংলাদেশের প্রথম ওপেনার হিসেবে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে ইনিংসে ২০০’র বেশি বল খেলার রেকর্ড গড়লেন জয়। এর আগে ২০০৮ সালে জুনায়েদ সিদ্দিকী খেলেছিলেন সর্বোচ্চ ১৪৪ রান। সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে আপাতত ২১১ বল খেলে অপরাজিত রয়েছেন জয়।

বাংলাদেশের ইনিংসের ৫৩তম ওভারের চতুর্থ বলে এক রান নিয়ে মাইলফলকে পৌঁছান জয়। যা করতে তিনি খেলেন ১৬৫ বল। যুব ওয়ানডেতে চারটি সেঞ্চুরি করেছিলেন জয়, সবকয়টিই দেশের বাইরে। এর মধ্যে একটি ছিল শুধু শ্রীলঙ্কায়। বাকি তিনটি ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ডে। এছাড়া নিউজিল্যান্ডে একটি ৯৯ রানের ইনিংসও আছে তার।

এতেই বোঝা যায়, দ্রুতগতির উইকেটেই তুলনামূলক ভালো খেলেন এ তরুণ ডানহাতি। এমনকি চলতি সফরের একমাত্র প্রস্তুতি ম্যাচেও ৬৬ রানের ইনিংস খেলেছিলেন জয়। যা তাকে দেয় বাড়তি আত্মবিশ্বাস। আর এতে ভর করেই কিউইদের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসেই খেলছেন ঝকঝকে ইনিংস।

ইনিংস সূচনা করতে নেমে জয় শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থাকলেও দিন শেষ হওয়ার মিনিট ত্রিশেক আগে ওয়াগনারের দ্বিতীয় শিকারে পরিণত হন নাজমুল শান্ত। আউট হওয়ার আগে ইনিংসের ৫১তম ওভারের দ্বিতীয় বলে দৃষ্টিনন্দন এক স্লগ সুইপে বিশাল ছক্কা হাঁকিয়ে নতুন বছরে বাংলাদেশের প্রথম হাফসেঞ্চুরিয়ান হয়ে যান শান্ত।

ওয়াগনারের বলে গালিতে ধরা পড়ার সময় শান্তর নামের পাশে ছিল ১০৯ বলে ৭ চার ও ১ ছয়ের মারে ৬৪ রানের ইনিংস। তার আগে বাংলাদেশের ইনিংসের ১৯তম ওভারে দলীয় ৪৩ রানে ওয়াগনারের প্রথম শিকারে পরিণত হন ২২ রান করা সাদমান ইসলাম অনিক।

আজকের প্রথম সেশনে বিনা উইকেটে ৫ রান করা বাংলাদেশ দল দ্বিতীয় সেশনে ২৮ ওভারে ১ উইকেট হারিয়ে করে ৬৫ রান। তৃতীয় সেশনে আরও ১ উইকেট হারিয়ে ৩৬ ওভারে ১০৫ রান করেছে বাংলাদেশ।

এর আগে বল হাতে আজ দিনের প্রথম সাফল্য পেতে খুব বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি বাংলাদেশকে। দিনের পঞ্চম ওভারের শেষ বলে রাচিন রবীন্দ্রকে সাদমান ইসলামের হাতে ক্যাচে পরিণত করেন শরিফুল ইসলাম। আউট হওয়ার আগে রাচিন করতে পেরেছেন কেবল ৪ রান।

সপ্তম উইকেটে মাঝারি প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন হেনরি নিকলস ও কাইল জেমিসন। এবাদত হোসেনের করা ৯৮তম ওভারে পরপর তিন বাউন্ডারি হাঁকান নিকলস। যার প্রথমটিতে ব্যক্তিগত পঞ্চাশে পৌঁছে যান এ বাঁহাতি ব্যাটার।

তবে বিপদ বেশি বাড়তে দেননি বাংলাদেশের অফস্পিনার মেহেদি হাসান মিরাজ। ইনিংসের ১০০তম ওভারে আক্রমণে এসে তৃতীয় বলেই সুযোগ তৈরি করেন তিনি। কিন্তু শর্ট লেগে দাঁড়ানো মাহমুদুল জয় সেটি হাতে রাখতে পারেননি, বেঁচে যান জেমিসন।

অবশ্য জীবন পেয়েও তা কাজে লাগাতে পারেননি জেমিসন। মিরাজের পরের ওভারেই লং অন বাউন্ডারিতে দাঁড়ানো সাদমানের হাতে ধরা পড়ে যান তিনি। তাসকিন আহমেদের করা পরের ওভারে জোড়া বাউন্ডারি হাঁকিয়ে পাল্টা জবাব দেওয়ার আভাস দেন টিকে থাকা একমাত্র স্বীকৃত ব্যাটার নিকলস।

একপ্রান্তে নিকলস টিকে থাকলেও অন্যপ্রান্তে টপাটপ আরও দুই ব্যাটারকে সাজঘরে পাঠান মিরাজ। ইনিংসের ১০৬তম ওভারের চতুর্থ বলে শর্ট মিডউইকেটে মুমিনুলের হাতে ধরা পড়েন টিম সাউদি, পরের বলে কট বিহাইন্ড হন নেইল ওয়াগনার। দারুণ রিভিউ নিয়ে ওয়াগনারের বিদায় নিশ্চিত করে বাংলাদেশ।

উইকেটের কলামে মিরাজের নামের পাশে সংখ্যা আরও বাড়তে পারতো। কিন্তু এবার তার বলে লংঅন থেকে ছুটে যায় ক্যাচ, হয়ে যায় বাউন্ডারি, বেঁচে যান ট্রেন্ট বোল্ট। তবে পরের ওভারের প্রথম বলেই ৭৫ রান করা নিকলসকে সাজঘরে পাঠিয়ে নিউজিল্যান্ডের ইনিংস গুটিয়ে দেন বাংলাদেশ অধিনায়ক মুমিনুল হক।

বল হাতে বাংলাদেশের পক্ষে তিনটি করে উইকেট নেন শরিফুল ও মিরাজ, মুমিনুলের শিকার দুই উইকেট। ফিল্ডিংয়ে সাদমান নেন ৪টি ক্যাচ। বাংলাদেশের দ্বিতীয় ফিল্ডার হিসেবে টেস্টের এক ইনিংসে ৪ ক্যাচ নিলেন তিনি। এর আগে সৌম্য সরকার শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২০১৭ সালে নিয়েছিলেন ৪ ক্যাচ।