দেশে করোনায় চার জেলায় আরও ৭৪ জনের মৃত্যু

44

দেশে করোনার তৃতীয় ঢেউ প্রকোপ আকার ধারণ করেছে; তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রতিদিনই শত শত মানুষ ঝরে পড়ছে করোনা ভাইরাসে। সবশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের চার জেলায় আরও নতুন ৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। যার মধ্যে খুলনার চার হাসপাতালে ২২,রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ১৮ এবং কুষ্টিয়া ও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে ১৭ জন করে মারা গেছেন। বিস্তারিত প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে-

খুলনা : খুলনার চার হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। খুলনা করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে নয়জন, গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আটজন, জেনারেল হাসপাতালের করোনা ইউনিটে দুইজন ও আবু নাসের হাসপাতালে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।

খুলনা ডেডিকেটেড করোনা হাসপাতালের ফোকাল পার্সন ডা. সুহাস রঞ্জন হালদার জানান, হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৯৩ জন। যার মধ্যে রেড জোনে ১২৯ জন, ইয়ালো জোনে ২৫ জন, আইসিইউতে ১৯ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছেন ৩২ জন। আর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৫১ জন।

শহীদ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালের করোনা ইউনিটে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন- খুলনার ডুমুরিয়ার আবুল বাশার মোল্লা (৪৬), বটিয়াঘাটার রিজিয়া বেগম (৬৫) ও ঝিনাইদহ কালিগঞ্জের সিরাজুল ইসলাম (৬৫)। এছাড়া হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ৪৫ শয্যার বিপরীতে ভর্তি রয়েছেন ৪৩ জন। তার মধ্যে আইসিইউতে রয়েছে ১০ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছেন চারজন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন একজন।

জেনারেল হাসপাতালের ৮০ শয্যার করোনা ইউনিটের মুখপাত্র ডা. কাজী আবু রাশেদ জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন- খুলনার রূপসার বাগমারার আনসার শেখ (৬০) ও দিঘলিয়ার উত্তর চন্দনীমহলের আমেনা বেগম (৮০)। এছাড়া চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৬৮ জন, তার মধ্যে ৩৩ জন পুরুষ ও ৩৫ জন নারী। গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছেন ১৮ জন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১৩ জন।

গাজী মেডিকেল হাসপাতালের স্বত্বাধিকারী ডা. গাজী মিজানুর রহমান জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালের করোনা ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আটজনের মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন- নগরীর টুটপাড়ার আব্দুল কাদের (৬১), খুলনার রূপসার শামিমা আক্তার (৫০), বাগেরহাটের ফকিরহাটের সুভাস দত্ত (৬১), যশোর সদরের সুজনপুরের নূর জাহান (৭৫), নড়াইলের কালিয়ার বাকা এলাকার নাসিমা বেগম (৫৬), চুয়াডাঙ্গার দর্শনা বাজারের আব্দুর রশিদ (৪৫), পিরোজপুর নাজিরপুরের সাকিনা বেগম (৬৫) ও যশোর সদরের বেজপাড়ার দুলাল চন্দ্র ঘোষ (৬৫)।

বেসরকারি এ হাসপাতালের চিকিৎসাধীন রয়েছেন আরও ১২৪ জন। এরমধ্যে আইসিইউতে রয়েছেন ৯ জন ও এইচডিইউতে আছেন ১১ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছেন ২১ জন এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২০ জন। পিসিআর ল্যাবে ৬২টি নমুনা পরীক্ষায় ৪৪ জনের করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে।

রাজশাহী : প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের করোনা ইউনিটে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরমধ্যে করোনা আক্রান্ত হয়ে আটজন ও উপসর্গে ১০ জন মারা গেছেন।

বৃহস্পতিবার (৮ জুলাই) সকালে রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, বুধবার (৭ জুলাই) সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত রামেক হাসপাতাল করোনা ইউনিটের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ১৮ জন মারা গেছেন। এরমধ্যে পুরুষ ১৪ জন ও নারী চারজন। মৃতদের অধিকাংশের বয়স ৩৫ থেকে ৬৫ বছরের মধ্যে।

তিনি বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ১৮ জন মৃতদের মধ্যে রাজশাহী জেলারই নয়জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের দুইজন, নাটোর দুইজন, নওগাঁর তিনজন, পাবনার একজন ও কুষ্টিয়ার একজন ছিলেন। করোনা সংক্রমণে মারা গেছেন রাজশাহীর চারজন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের একজন, পাবনার একজন, কুষ্টিয়ার একজন ও নওগাঁর একজন।

অন্যদিকে উপসর্গে মারা গেছেন রাজশাহীর পাঁচজন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের একজন, নওগাঁর দুইজন ও নাটোরের দুইজন। সকলকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে দাফন করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

রোগীদের ভর্তি ও সংক্রমণের বিষয়ে রামেক পরিচালক জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় রামেকে নতুন ভর্তি হয়েছেন ৭০ জন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৪৮ জন। রামেকে করোনা আক্রান্ত হয়ে ২০২ জন এবং সন্দেহভাজন ও উপসর্গ নিয়ে ২৮৩ জন ভর্তি রয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় রামেকে ৪৫৪টি শয্যার বিপরীতে রোগী ভর্তি ছিলেন ৪৮৫ জন। এদিকে করোনা পরীক্ষার বিষয়ে রামেকের পরিচালক শামীম ইয়াজদানী জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় রামেক হাসপাতালের পিসিআর মেশিনে ১৮৮টি নমুনা পরীক্ষায় ২৮ জনের করোনা পজিটিভ রিপোর্ট এসেছে। অন্যদিকে মেডিকেল কলেজের পিসিআর মেশিনে ৩৭৬ জনের নমুনা পরীক্ষায় ১১৩ জন করোনা পজিটিভ রিপোর্ট আসে।

দুই ল্যাবের টেস্টে মোট ৫৬৪ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এতে ১৪১ জনের করোনা পজিটিভ রেজাল্ট আসে। পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হার ২৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ।

কুষ্টিয়া: কুষ্টিয়ায় করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর মিছিল কিছুতেই থামছে না। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে এবং উপসর্গ নিয়ে আরও ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে করোনা আক্রান্ত হয়ে ১০ জন এবং করোনার লক্ষণ নিয়ে সাত জনের মৃত্যু হয়েছে।

বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টায় কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এম এ মোমেন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত এবং উপসর্গ নিয়ে রোগী ভর্তির চাপ প্রতিদিনই বাড়ছে। জেলার ২৫০ বেডের করোনা ডেডিকেটেড এই হাসপাতালটিতে এখন শয্যার চেয়ে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি। করোনা আক্রান্ত এবং উপসর্গ নিয়ে বুধবার সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ২৮৯ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাই ২০২ জন। আর উপসর্গ নিয়ে ভর্তি রয়েছেন ৮৭ জন।

হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. তাপস কুমার সরকার জানান, শয্যা না থাকায় এখন রোগীদের মেঝেতে ও করিডোরে রাখতে হচ্ছে। প্রতিদিনই হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত এবং উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। রোগীর চাপ যেভাবে বাড়ছে তাতে সেবা প্রদান করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এদিকে কুষ্টিয়া পিসিআর ল্যাবে গত ২৪ ঘণ্টায় ৭৪৩টি নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে নতুন করে ২৩২ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ৩১ দশমিক ২২ ভাগ। এ নিয়ে জেলায় করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াল ৯ হাজার ৬৬৪ জনে। এর মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ৬ হাজার ৩০ জন। মৃত্যের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২৮৬ জনে।

নতুন করে শনাক্ত হওয়া ২৩২ জনের মধ্যে রয়েছেন কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় ৬২ জন, দৌলতপুর উপজেলায় ৪২ জন, কুমারখালী উপজেলায় ৫৯ জন, ভেড়ামারা উপজেলায় ২৯ জন, মিরপুর উপজেলায় ২৫ জন ও খোকসা উপজেলায় ১৫ জন।

এখন পর্যন্ত জেলায় ৬৬ হাজার ৮৯৬ জনের নমুনা পরীক্ষার জন্য নেয়া হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়া গেছে ৬৫ হাজার ৯০২ জনের। বাকিরা নমুনা পরীক্ষার প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছেন। বর্তমানে কুষ্টিয়ায় সক্রিয় করোনা রোগীর সংখ্যা ৩ হাজার ২২১ জন। তাদের মধ্যে হাসপাতালে আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন আছেন ২৬৫ জন এবং হোম আইসোলেশনে আছেন ২ হাজার ৯৫৬ জন।

ময়মনসিংহ : ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের করোনা ইউনিটে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে করোনা আক্রান্ত পাঁচজন ও উপসর্গ নিয়ে ১২ জন মারা গেছেন।

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকালে মমেক হাসপাতালের করোনা ইউনিটের ফোকালপারসন ডা. মহিউদ্দিন খান মুন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

উপসর্গে মৃতরা হলেন- ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার ইব্রাহিম (৫০), নান্দাইলের রুপা (১৯), সদরের ডা. মো. মোস্তফা (৭৩), আব্দুল আজিজ (৪২), জামালপুর সদরের আবু বক্কর (৫৯), মোজাহিদ (২২), সরিষাবাড়ির নারগিস (২২), শেরপুর সদরের রিপন ঘোষ (৪৫), রাশিদা বেগম (৪০), নালিতাবাড়ির শামিমা বেগম (৪৫), নেত্রকোনা সদরের আব্দুল জব্বার (৯২), ও হোসেন আলী (৮০)।

ডা. মহিউদ্দিন খান মুন বলেন, ‘আইসিইউর ২১ জনসহ মোট ৩৭১ জন রোগী করোনা ইউনিটে ভর্তি আছেন। নতুন ভর্তি হয়েছেন ৫৫ জন, সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২৯ জন। করোনা ইউনিটে নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়েছেন ২৪৪ জন।’

ময়মনসিংহ জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পিসিআর ল্যাব ও এন্টিজেন টেস্টে ৬৪৫টি নমুনা পরীক্ষা করে ২৩৬ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে।