দেশে চাল উৎপাদনে নিরব বিপ্লব : ৫০ বছরে উৎপাদন বেড়েছে ৪ গুণ

47

স্বাধীনতার পর দেশের অর্জনগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো কৃষিখাতে ব্যাপক সফলতা। সফলতার মধ্যে চাল হচ্ছে বড় অর্জণ। একদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে সেইহারে পাল্লা দিয়ে কমেছে আবাদযোগ্য জমি। তার পরেও জলবায়ুসহনশীল কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্য ধানের চাষাবাদ করায় চালের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৭১-৭২ সালে যেখানে চাল উৎপাদন ছিল মাত্র ১ কোটি মেট্রিক টন, সেখানে ২০২০ সালে তা বেড়ে প্রায় ৪ কোটি মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে। একসময়ের খাদ্য ঘাটতির দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। ৫০ বছরে চাল উৎপাদন ৪ গুণ বেড়েছে।

চাল উৎপাদন বৃদ্ধির কারনে চাল উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো তৃতীয় অবস্থানে উঠে আসে গত অর্থবছর। ওই অর্থবছরে দেশে ৩ কোটি ৫৯ লাখ টন চাল (মিলড রাইস) উৎপাদন হয়। যদিও চলতি অর্থবছরে প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবে উৎপাদনে ছন্দপতন ঘটায় চতুর্থ অবস্থানে নেমে আসে বাংলাদেশ। তবে আগামী অর্থবছরে চাল উৎপাদন প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার টন বাড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক কৃষি সেবা বিভাগের ইউনাইটেড স্টেটস ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচার (ইউএসডিএ)। এতে ইন্দোনেশিয়াকে টপকে বাংলাদেশ আবারো তৃতীয় অবস্থানে ফিরে আসবে।

বৈশ্বিক কৃষি উৎপাদন পরিস্থিতির সর্বশেষ তথ্য নিয়ে সম্প্রতি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ইউএসডিএ। চলতি বছর (২০২১) মে মাসের সংখ্যায় প্রকাশিত বৈশ্বিক কৃষি উৎপাদন প্রতিবেদনে এমন পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।

ইউএসডিএর তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরে দেশে চাল উৎপাদন হয়েছে ৩ কোটি ৪৬ লাখ টন, ২০২১-২২ অর্থবছর যা বেড়ে দাঁড়াবে ৩ কোটি ৫৩ লাখ ৩০ হাজার টনে। অন্যদিকে চলতি অর্থবছর ইন্দোনেশিয়ায় চালের উৎপাদন ছিল ৩ কোটি ৫২ লাখ টন, যা ২০২১-২২ অর্থবছর হবে ৩ কোটি ৫৩ লাখ টন। ফলে আগামী অর্থবছর ইন্দোনেশিয়ার চেয়ে বাংলাদেশে চাল উৎপাদন বাড়বে ৩০ হাজার টন। ফলে চীন ও ভারতের পর চাল উৎপাদনে তৃতীয় স্থানটি দখলে নেবে বাংলাদেশ। এদিকে চাল উৎপাদনকারী শীর্ষ চার দেশের মধ্যে শুধু ভারতে পণ্যটির উৎপাদন কমবে। বাংলাদেশে হেক্টরপ্রতি ফলন কম হলেও আবাদি জমির পরিমাণ বাড়বে। এতে সামগ্রিকভাবে দেশে চাল উৎপাদন বাড়বে।

জানা গেছে, ২০২১-২২ অর্থবছর বিশ্বে চাল উৎপাদন ৫০ কোটি ৫৪ লাখ ৫০ হাজার টন ছাড়াতে পারে। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের চেয়ে এটি প্রায় ২০ লাখ টন বেশি। আগামী অর্থবছর চীন ১৪ কোটি ৯০ লাখ টন চাল উৎপাদনের মাধ্যমে শীর্ষেই অবস্থান করবে। চলতি অর্থবছরের চেয়ে দেশটিতে উৎপাদন বাড়বে প্রায় সাত লাখ টন। অর্থবছরটিতে ভারতে চাল উৎপাদন হবে ১২ কোটি টন, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১০ লাখ টন কম। ২০১৯-২০ অর্থবছরের আগ পর্যন্ত দীর্ঘদিন ধরে তৃতীয় স্থানটি দখলে রেখেছিল ইন্দোনেশিয়া। আগামী অর্থবছর দেশটিতে চাল উৎপাদন হবে ৩ কোটি ৫৩ লাখ টন। চলতি অর্থবছরের তুলনায় এটি এক লাখ টন বেশি।
তবে স্বাধীনতার পর থেকে গত ৫০ বছরে চালের উৎপাদন চার গুণেরও বেশি বেড়েছে বলে দাবি করেছেন কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ও দূরদর্শিতায় সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ফলে দেশে কৃষিখাতে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, শুধু চালের মোট উৎপাদন নয়, চালের উৎপাদনশীলতায়ও দেশ অনেক এগিয়ে গেছে। ১৯৯১ সালে হেক্টরপ্রতি চালের গড় উৎপাদন ছিল ১ দশমিক ৭১ টন। আর ২০২০ সালে হেক্টরপ্রতি চাল উৎপাদন হয়েছে গড়ে চার টনেরও বেশি। কৃষি গবেষণার মাধ্যমে ফসলের উন্নত জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন, কৃষি উপকরণে ভর্তুকি প্রদান ও সহজলভ্যকরণ, সারের সুষম ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, সেচসুবিধা সম্প্রসারণ, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্যই কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ফলেই এ সাফল্য অর্জিত হয়েছে।

ড. রাজ্জাক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বেশি বিরূপ প্রভাব পড়বে দক্ষিণ এশিয়ার কৃষিতে। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ার খাদ্য ব্যবস্থা দুর্বল হবে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সম্মিলিতভাবে জলবায়ুসহনশীল কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কাজ করতে হবে।