প্রো-ভিসির লাইনে বির্তকিত চিকিৎসক ডা. ছয়েফ উদ্দিন আহমেদ!

বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে হাইব্রিড চিকিৎসকদের দাপটে ত্যাগীরা কোনঠাসা

72

দেশের রাজনীতি অনেকটাই ফুটবলাদের জার্সি বদলের ন্যায় ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তিত হচ্ছে। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে দল পরিবর্তনের হিড়িক পড়ে। ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্য এরা নীতি আদর্শ নির্বাসনে পাঠিয়ে স্বার্থ উদ্ধারে নিজের নাম লেখানোর প্রতিযোগিতায় নামে। নিজেদের অতীতকে ঢাকতে এরা হয়ে ওঠেন বড় আওয়ামী লীগার। সচরাচর এদেরকে হাইব্রিড বা কাউয়া বলে চিহ্নিত করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এই হাইব্রিড খাতায় নাম লেখাতে পিছিয়ে নেই দেশের চিকিৎসক সমাজও।

এই সব ভূঁই-ফোঁড় চিকিৎসকদের দাপট দিনকে দিন প্রকট আকার ধারন করেছে। বিএনপি-জামায়াত ঘরানার অনেক চিকিৎসকই এখন জার্সি বদল করে আওয়ামী লীগার সেজেছেন। ক্ষমতাসীন দলের ভিতরে ঘাপটি মেরে থাকাদের সহনাভুতির সুযোগ নিয়েছেন। বর্তমানে তদবিরের জোরে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে তৎপর হয়েছেন। তারা সরকারের নানান সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। চিকিৎসকের দায়িত্ব পালনেও এদের গাফলতি রয়েছে। এমনও দেখা গেছে এরা রোগীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করে থাকেন।অভিযোগ উঠেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) প্রো-ভিসি (প্রশাসন) প্রফেসর ডা. ছয়েফ উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে।

অভিযুক্ত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী যখন দেশের বিরোধী দলে তখন তার স্বামী প্রয়াত ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়াকে সুধা সদনের বাসায় গিয়ে চিকিৎসা করতে অস্বীকার করেন ডা.ছয়েফ উদ্দিন আহমদ। এমনকি নিজে অন্য চিকিৎসকদের যেতেও নিরুৎসাহিত করেন। ডা.ছয়েফ উদ্দিন তখন বিএনপি ঘরানার চিকিৎসকদের সংগঠন ড্যাবের একজন প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। এরপর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরলে তিনি ভোল পাল্টে সাচ্চা আওয়ামী লীগার বনে যান। যার পুরস্কারও তিনি হাতে হাতে পেয়েছেন। যিনি দেশের একজন সেরা বিজ্ঞানীর চিকিৎসা দিতে অস্বীকার করেছিলেন, সেই তিনিই এখন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন। এখানেই শেষ নয়, বর্তমানে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন পদে রয়েছেন। শোনা যাচ্ছে তিনি বিশ^বিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (প্রশাসন) পদে মনোনয়ন পাচ্ছেন। এ নিয়ে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) নেতাসহ সিনিয়র চিকিৎসকদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা বলছেন, হাইব্রিডরা এখন সব সুযোগ নিচ্ছেন এবং পাচ্ছেন। যদিও দলের বিপদে তাদের সেবা দল পাবে না। তারপরেও তাদেরকে পুরস্কৃত করার খেলা কোনভাবেই থামছে না। স্বাচিপের একাধিক নেতা বিষয়টি এভাবেই বর্ণনা করলেন।

পরমানু বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের নেতারা বলেন, বিএনপি জামাত জোট যখন ক্ষমতায় তখন দেশের এই কৃতি পরমানু বিজ্ঞানী সুধা সদনের বাসায় থাকতেন। ওই সময় তিনি হঠাৎ পা পিছলে পড়ে গিয়ে মারাত্বক আঘাত প্রাপ্ত হন। তখন তাকে জরুরি চিকিৎসার জন্য সাবেক পিজি হাসপাতাল বর্তমানে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জারি বিভাগের প্রধান এই ডা.ছয়েফ উদ্দিন আহমেদকে কল দেওয়া হয়। খবর পেয়ে তখনকার স্বাচিপ নেতা নিউরোলজি বিভাগের ডা. আবু নাসার রিজভী নিজে ড. ওয়াজেদ মিয়ার জরুরি চিকিৎসার জন্য সুধা সদনের বাসায় যেতে অনুরোধ করেন। বার বার অনুরোধ করা সত্বেও তিনি যেতে অস্বীকার করেন। তখন রিজভী সাহেবের অনুরোধে ইউরোলজি বিভাগের ডা. সাইফুল হোসেন দিপু সুধাসদনে গিয়ে বিশিষ্ট বিজ্ঞানীর চিকিৎসা দেন। এসময় এই বিশিষ্ট বিজ্ঞানীর মাথায় কয়েকটি সেলাই দিতে হয়। যা নিশ্চিত করেছেন স্বাচিপ নেতারা। আর এখন সেই ডা. ছয়েফ উদ্দিন আহমেদ বড় আওয়ামী লীগার সেজে দলের সবধরনের সুবিধা ভোগ করছেন?

ডা. ছয়েফ উদ্দিনের পরিবারের রাজনীতির ইতিহাস সর্ম্পকে জানা গেছে,তার এক ভাই বিএনপি জামাত জোট আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা প্যানেলের থেকে নির্বাচন করে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরে তিনি দলীয় পরিচয়ে সিলেট শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

অভিযোগ রয়েছে, ডা. ছয়েফ উদ্দিন নিজে অত্যান্ত বদ মেজাজী, ডাক্তার ও কর্মচারীদের সঙ্গে রূঢ় আচরন করে থাকেন। তার আচরনের কারনে তিনি অনেকটাই অ-জনপ্রিয়। এরপরও দুর্ভাগ্য জনক ভাবে মুজিব বর্ষে তাকে প্রো-ভিসি করার সংবাদ সামনে এসেছে। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে অবৈধ পথে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে তিনি তার নিজ এলাকা সিলেটের মৌলভী বাজারে একটি প্রাইভেট হাসপাতাল তৈরি করেছেন।

এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন স্বাচিপ সভাপতি প্রফেসর ইকবাল আর্সলান। তিনি বলেছেন, তাকে সরকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (প্রশাসন) করেছেন। আমার কাছে সরকার জানতেও চাননি। বিধায় এ বিষয়ে কিছু বলতে পারছি না। তবে প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার স্বামী প্রয়াত ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়াকে সুধা সদনের বাসায় গিয়ে চিকিৎসা করতে অস্বীকার করেছেন অধ্যাপক ডা. ছয়েফ উদ্দিন আহমেদ এটি একটি সত্য ঘটনা। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, তদবিরকারকরা তদবিরের জন্য যায়। আবার তাদের তদবির আলোর মুখও দেখে।

বিষয়টি নিয়ে কথা হয় বিএসএমএমইউ স্বাচিপ নেতা ডা. আবু নাসার রিজভীর সঙ্গে। তিনি যেমনটি বলছিলেন। প্রয়াত ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া আহত হওয়া অনেক দিনের আগের ঘটনা ( ২০০৩ সালের মাঝামাঝি সময়) তখন রাষ্ট্রক্ষমতায় চারদলীয় জোট। আজকের ডা.ছয়েফ উদ্দিন তখন বিএনপির জাঁদরেল নেতা। দলীয় আদর্শগত কারনে সেদিন তিনি তার পেশাগত দায়িত্ব অবহেলা করেছিলেন।তারপরেও সরকার তাকে পুরস্কৃত করতে চাইছেন। জাতি হিসাবে এটা আমাদের জন্য লজ্জার। দেশের রাজনৈতিক দলের মধ্যে আওয়ামী লীগ বড় দল। এছাড়াও দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায়। দেশের একমাত্র মেডিক্যাল বিশ^বিদ্যালয়ের প্রশাসন সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য প্রো-ভিসি (প্রশাসন) নিয়োগ দেওয়া সরকারের রুটিং ওয়ার্ক। কিন্তু সেখানে ছয়েফ উদ্দিনের মত একজন বির্তকিত ব্যাক্তিকে নিয়োগ দেওয়া অনেকটাই অপ্রত্যাশিত। একজন সাধারণ আওয়ামী লীগের আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে এর চেয়ে বেশি কি-ই বা বলতে পারি?

ড.ওয়াজেদ মিয়ার সেই দুঃসময়ে সুধাসদনে চিকিৎসা সেবা প্রদানকারী সাহসী চিকিৎসক (ইউরোলজি বিভাগের) ডা. সাইফুল হোসেন দিপু। তার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঘটনাটি আজ থেকে প্রায় ১৮ বছর (২০০৩ সালের মধ্য সময়ে) আগের। পেশাগত দায়িত্ব বোধ থেকে আমি সেখানে গিয়েছি। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব দেখিয়ে আমি চিকিৎসা করেছি। বর্তমানে কাকে কে ক্ষমতা দিবে, সেটা আল্লাহ্র ইচ্ছা। তবে আমি মনে করি বিষয়টি সরকারের আরও গভীরভাবে ভেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

ঘটনা স্বীকার করে বিএসএমএমইউ এর সাবেক ভিসি প্রফেসর ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, আমি অন্য একটি জায়গায় অপারেশনে আছি। বর্তমানে আমি ক্ষমতায়ও নেই। এই মুহর্তে কথা বলা সমস্যা হচ্ছে। তবে ওয়াজেদ মিয়ার চিকিৎসা বিষয়ক ঘটনার কথা স্বীকার করেন তিনি।

অভিযোগের বিষয়ে ডা. ছয়েফ উদ্দিনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিফ করেননি।

উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার স্বামী প্রয়াত ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়াকে সুধা সদনের বাসায় গিয়ে চিকিৎসার বিষয়ে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত থাকায় অনেকেই নিজেদের নাম প্রকাশে অনিচ্ছা দেখিয়েছেন। তবে তারা প্রো-ভিসিসহ জার্সি বদলকারী হাইব্রিড চিকিৎকদের অপসারণের দাবি তুলেছেন।