ফুটপাত-রাস্তায় বাজার, নেপথ্যে কোটি টাকার বাণিজ্য

6

রাজধানীর যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তার তিন পাশেই প্রধান সড়ক দখল করে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন পণ্যসামগ্রীর বাজার। ফলে চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে যানবাহন ও পথচারীদের। প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। একশ্রেণীর অসাধু ব্যাক্তি ও রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে প্রতিমাসে চাঁদাবাজির মাধ্যমে হাতিয়ে নিচ্ছে অধ’ কোটি টাকা। এ চিত্র যে পুরো দেশ জুড়ে। বিশেষ করে রাজধানী জুড়ে। বহুবার রিপোর্ট করেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। বরং দিন দিন আরও বাড়ছে বাজার, বাড়ছে চাঁদাবাজি। যেন দেখার কেউ নেই!

যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা হলো একটি ব্যাস্ততম ও গুরুত্তপুন’ রাস্তা। এসব রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন চলাচল করে সিটি ও আন্তঃজেলার বাসসহ বিভিন্ন ছোটবড় হাজার হাজার যানবাহন ও পথচারী। ফলে প্রতিদিন প্রায় সময় লেগে থাকে যানজট। এরমধ্যে প্রধান সড়ক দখল করে গড়ে ওঠা বাজার চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে কিছু চাঁদাবাজদের ছত্রছায়ায় অবাধে চলছে এসব বাজার।

এখানকার পথচারী মনির ও সুমন জানান, এমনিতেই পরিবহনের জন্য ঝুঁকি নিয়ে হাটতে হয়, এরমধ্যে প্রায় অর্ধেক রাস্তা জুড়ে বাজার হওয়ায় চরম দূভো’গে পরতে হচ্ছে। বাসচালক গনি বলেন, এসবের কারনে আমরা বিড়ম্বনায় পরছি। খোজ নিয়ে জানা যায়, এখানের বিবিরবাগিচার ১নম্বর গেট হতে পার্ক হয়ে মসজিদ পয’ন্ত, শহীদ ফারুক রোডের মোড় হতে খানকা শরীফ মসজিদ পয’ন্ত ও সামাদ সুপার মার্কেট হতে দোলাইরপার যাওয়ার রাস্তার অনেক অংশে গড়ে উঠেছে প্রায় সাতশত হকারের বাজার। আর কয়েকটি ছোট ছোট গ্রুপের চাঁদাবাজরা নিয়ন্ত্রন করেছে এসব বাজার। তবে এই টাকা দিয়ে অনেককে ম্যানেজ করতে হয় বলে অনেকে জানান।

সরেজমিনে ঘুরে বিভিন্ন সুত্রে পাওয়া যায় এসব তথ্য। বিবিরবাগিচা ১নম্বর গেট হতে মসজিদ পয’ন্ত: এখানে রয়েছে ফলসহ ছোটবড় প্রায় দেড়শ দোকান। এখানে চাঁদা উঠায় কয়েকটি গ্রুপ। এরমধ্যে স্থানীয় ওয়ার্ড সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জাহিদ হোসেন জুয়েল অন্যতম। সে প্রতি দোকান হতে দুইশত টাকা করে চাঁদা নেয়। জুয়েলের টাকা আদায় করে সাজ্জাদ, শাওন ও সাইফুল।

অন্যদিকে কাবিলা প্রতি ফলের দোকান হতে চাঁদা নেয় ১৫০ টাকা। রনি, জনি, সনি ও জামাই সেলিম নেয় ১৫০ টাকা। এছাড়া এখানের প্রায় ২৫টি দোকান হতে ৪-৫শত টাকা নেয় জাহাঙ্গীরসহ কয়েক জন। এরা স্থানীয় সাবেক ছাত্রলীগ নেতা-কর্মী বলে জানা যায়। এখানে বিদ্যুৎ বাবদ প্রতি লাইট হতে গড়ে ৫০টাকা করে নেয় জসিম। অর্থাৎ প্রতিটি ফলের দোকানদাররা প্রতিদিন চাঁদা দিচ্ছে ৫-৬শত টাকা। এপাশে মাসে মোট চাঁদা আদায় হয় প্রায় ২৪লাখ টাকা। এখানের ফল বিক্রেতা হালিমসহ কয়েকজন জানায়, আমরা কয়েকটি গ্রুপকে প্রতিদিন বিদ্যুৎসহ ৫থেকে ৬শত টাকা চাঁদা দিয়ে থাকি।

সামাদ সুপার মার্কেটের সামনে রাস্তার ওপর চৌকি বিছিয়ে বসেছে ছোটবড় প্রায় ১২০ টি দোকান। এখানে প্রতি দোকান হতে প্রতিদিন চাঁদা আদায় হয় একশত থেকে দেড়শত টাকা। এ চাঁদা নেয় ৫০নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগ নেতা-কর্মী পরিচয়দানকারী সাইকেল চোর হাবু, শামীম ও ডিম রাসেল। এখানে প্রতি মাসে চাঁদা আদায় করা হয় প্রায় সাড়ে পাচ লক্ষ টাকা। এখানের পোশাক বিক্রেতা আলম জানান, প্রতিদিন বিদ্যুৎসহ একশত থেকে দেড়শত টাকা চাঁদা দিতে হয়। না দিলে বসতে দিবে না।

শহীদ ফারুক রোডের বিশাল এলাকার প্রধান সড়ক ও ফুটপাত দখল করে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন পণ্যসামগ্রীর প্রায় তিনশত দোকান। এসব দোকান নিয়ন্ত্রন করে তোরাব আলী নামক এক ব্যাক্তি। এখানে দোকানভেদে প্রতি দোকান হতে প্রতিদিন চাঁদা তুলে ২ থেকে আড়াইশ টাকা। এখানে প্রতিমাসে চাঁদা আদায় হয় প্রায় ২৩ লক্ষ টাকা। এই রোডে চলাচলরত লেগুনাচালক বাদশা জানায়, রাস্তাজুড়ে হকার বসায় বেশীরভাগ সময়ই যানজট লেগে থাকে। পথচারী শিউলি বলেন, একদিকে গাড়ি ও মানুষের চাপ। অন্যদিকে হকারদের রাস্তা দখলে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়।

এ ব্যাপারে ৪৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবুল কালাম অনু জানান, ‘যাত্রাবাড়ীর শেখ রাসেল নামের এই পার্কের সৌন্দর্য বজায় থাক আমি সেটা চাই। তাই পার্কের সামনে থেকে বাজার উঠিয়ে দিতে আমি মেয়র, ডিসি ওয়ারি ও সংশ্লিষ্ট থানাকে অবহিত করেছি।’

এদিকে এখানে দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টি আই) জাকারিয়া মেনন জানান, ‘আমরা আমাদের যতটুকু লোকবল আছে, তা দিয়ে মাঝে মাঝে দোকান উঠিয়ে দেই। কিন্ত আমরা চলে গেলে আবার এসে বসে। এই বাজার উঠিয়ে দিতে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি ‘।

এসব বিষয়ে ওয়ারী বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি, ট্রাফিক) সাইজুল ইসলাম জানান, ‘আমরা একদিকে এদের সরাই অন্যদিকে পুনরায় এসে বসে। আমাদের সদস্যদেরকে এই ব্যাস্ততম রাস্তার যানজট নিরসনে ব্যাস্ত থাকতে হয়। ফলে হকারদের পিছনে সার্বক্ষণিক সময় দেওয়া সম্ভব হয়ে উঠেনা। আবার মানবেতর ব্যাপার নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলে। তবে কোন রাজনৈতিক চাপ নেই বলে জানান তিনি। ’

এ ব্যাপারে ঢাকা-৫ এর সাংসদ কাজী মনিরুল ইসলাম মনু ও চাঁদাবাজদের সাথে সরাসরি ও মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কাউকে পাওয়া যায়নি।