বাঙালীর সার্বজনীন অসাম্প্রদায়িক উৎসব ‘পহেলা বৈশাখ’

মনিকা শর্মা :

 

আসা যাওয়ার বিরামহীন স্ত্রোতেই মহাকালের প্রবাহে ক্ষণবন্দি চলমান জীবন থেকে প্রস্থান হচ্ছে আরো একটি বছর। বছরের বিদায়লগ্নে চোখের সামনে এসে দাঁড়ায় ধূসর হয়ে আসা গল্পগাঁথার সারি সারি চিত্রপট। নিঃশব্দে থমকে আছে স্মৃতি-বিস্মৃতির কত আড়াল। বার বার মনের ভেতর উঁকি দেয় ব্যক্তিমানুষের একান্তই দুঃখ-যাতনা। রুক্ষ-ধূসর প্রকৃতির খরতাপচিহ্নে বাতাসে উষ্ণ ভাপের মাঝে বছর ঘুরে ঋতুচক্রের পালা বদলে আবারও পহেলা বৈশাখ সমাগত। বিগত দিনে বৈশ্বিক মহামারী করোনায় বাঙালির উৎসব পহেলা বৈশাখ আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করা না গেলেও এবার কিন্তু বাঙালি রোদের খরতাপ উপেক্ষা করে মিলবে সার্বজনীন অসাম্প্রদায়িক উৎসবে। বিশ্বের সকল প্রান্তের সকল বাঙালি এ দিনে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়, ভুলে যাবার চেষ্টা করে সদ্যঅতীত বছরের সকল দুঃখ-বঞ্চনা। সবার কামনা থাকে নতুন বছরটি যেনো সমৃদ্ধ ও সুখময় হয়। নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন, নতুন সংকল্প নেয়ার দিন এ বৈশাখের নবপ্রভাতেই প্রার্থনা হোক Ñ যা কিছু ক্লেদাক্ত, গ্লানিময়, যা কিছু জীর্ণ-শীর্ণ-দীর্ণ, যা কিছু পুরনো-তা বৈশাখের রুদ্র দহনে পুড়ে যেন ছাঁই হয়ে যায়। পুরনো বছরের সব নিষ্ফল সঞ্চয় উড়ে যাকÑদূরে যাক, যাক দূর-দিগন্তে মিলিয়ে।
স¤্রাট আকবর শাসন আমল থেকে পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ পালনের রেওয়াজ শুরু হয়। এ দিনে ভুলতে বসা কত স্মৃতি নতুন করে উঁকি দেয় মনে। জেগে ওঠে পুরনো বছরের কত পুরনো দৃশ্য। সামনে এসে নিঃশব্দে দাঁড়ায় স্মৃতি-বিস্মৃতির কত আড়াল। বিদায়ী বছরের সঙ্গে সঙ্গে বিগত দিনের দুঃখ বেদনা ভুলে নতুন দিনে নতুন করে সব শুরু করার তাগিদে মেতে উঠি আমরা।

বাংলা ক্যালেন্ডারের প্রথম মাস বৈশাখের প্রথম দিন বাঙালির নববর্ষ। বাঙালির উৎসবের দিন। পহেলা বৈশাখ আসতে মাত্র কদিন বাকি। এরই মধ্যে কিন্তু চারদিকে সাজ সাজ রব। কেউ বা যাচ্ছে শাড়ি কিনতে, কেউ বা চুড়ি আর কেউ বা যাচ্ছে পারলারে। নিজেদের সৌন্দর্য বৈশাখের প্রথম প্রহরের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে এই প্রস্তুতি শুরু। এ উৎসবেই মেয়েদের বৈশাখের রঙে নিজেদের রাঙানোর এত আয়োজন। মাথার চুল থেকে পা পর্যন্ত সাজে বাঙালি মেয়েরা।

করোনামুক্ত এই সময়ের বৈশাখী উৎসব, প্রাণের উৎসব, জাঁকজমক বর্ষবরণ হবেই। পহেলা বৈশাখ নিয়ে শুধু এ দেশের মানুষই নয়, পুরো পৃথিবীর বাংলা ভাষাভাষী মানুষের আছে আলাদা এক উৎসবকেন্দ্রিক প্রস্তুতি। বৈশাখের সাজে নিজেকে ইচ্ছামতো রাঙাতে কারো একটুও ক্লান্তি নেই।
রাজদরবার থেকে বটতলা পর্যন্ত এমনকী গ্রামে-শহরে, সমতলে-পাহাড়ে সর্বত্র নতুন বছরের আবাহন। সকলের বুক জুড়ে মিলিত উচ্চারণ-আমরা সকলেই বাঙালি। বাঙালির এ আনন্দ নিখাদ, এ সুখ অতুল, অনাবিল। এই বৈশাখের জাদুকরি ভেলকিতে নিরস-ধূসর জীবন যেন হয়ে উঠুক বর্ণিল ও প্রাঞ্জল এই হোক আমাদের প্রার্থনা। ঘর ছেড়ে রাস্তায় প্রাঙ্গণে নামবে মানুষ, মেতে উঠবে প্রাণের উৎসবে। এভাবেই আসে বৈশাখ। ঘরে ঘরে রান্না হয় পাঁচন। মিষ্টি ও উপাদেয় খাদ্যসম্ভারে প্লুত প্রতিটি পরিবার। যার যার সাধ্যমত আয়োজন।

পহেলা বৈশাখ ব্যবসায়ী মহলে হালখাতার দিন। হালখাতা উপলক্ষে ক্রেতা-বিক্রেতাদের লেনদেন সারাবছরে যে বাকি তা পরিশোধ করা হয়। নববর্ষ উপলক্ষে একে অপরের মধ্যে মানুষ শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।তাই বলা যায়, বাংলা নববর্ষ আমাদের সংস্কৃতিক আন্দোলনের বিশেষ উপাদান। এ উৎসব বাঙালির মিলনমেলার এক সেতুবন্ধন তৈরি করে। বাঙালির সর্বজনীন এ উৎসব তুলনাহীন, মাত্রাহীন এর আনন্দ। বারো মাসে তেরো পার্বণের এ দেশে এর চেয়ে বড়ো উৎসব নেই।

লেখিকা-সংগীত শিল্পী