প্রশাসনের চাপে বাড়ছে মাস্কের ব্যবহার

123

সারাবিশ্বে এখন করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের আতঙ্ক। বিশ্বব্যাপী লাফিয়ে বাড়ছে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার। করোনার সংক্রমণ রোধে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন করে লকডাউন, কারফিউ শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশেও এই শীতে করোনার সংক্রমণ রোধে মাস্ক পরিধানের বিষয়ে সরকারের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে রাজধানীতে ৩০-৪০ শতাংশ মাস্কের ব্যবহার বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার নির্দেশনা, নিয়মিত অভিযানের ভয় আর করোনায় সংক্রমণের আতঙ্ক থেকে জনসাধারণের মাঝে মাস্কের ব্যবহার বেড়েছে।

গত ১৬ নভেম্বর মন্ত্রিসভার বৈঠকে মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার নির্দেশনা দেয়া হয়। এরপর থেকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় নিয়মিত অভিযান চলছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাজওয়ার আকরাম জয়বাংলানিউজকে বলেন, আমি যখন গত সপ্তাহে কারওয়ান বাজারে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছিলাম তখন দেখেছি যে, ৬০-৭০ শতাংশ লোকের মুখে মাস্ক ছিল। গতকাল যে অভিযানটা করলাম দেখলাম যে ৯০ শতাংশের বেশি লোক মাস্ক পরছে। অভিযান পরিচালনার কারণে অবশ্যই সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

তিনি বলেন, এখন সবাই অন্তত মাস্ক বহন (ক্যারি) করছে বা কাছে আছে। কেউ হয়তো অন্য মনষ্ক হয়ে কাজের মাঝে কিছুক্ষণের জন্য খুলে রাখছে। এ প্রবণতা এখন বেশি দেখা যাচ্ছে। প্রায় শতভাগই মাস্ক বহন (ক্যারি) করছে কিন্তু ব্যতিক্রম হলো ৪-৫ শতাংশ মাস্ক ব্যবহার করছে না। কিন্তু তাদের কাছেও মাস্ক থাকে।

তাজওয়ার আকরাম আরও বলেন, এক সপ্তাহের ব্যবধানে জরিমানার পরিমাণও কিছু বেড়েছে। গতকালের অভিযানেও আমরা দুশ টাকার ঊর্ধ্বে জরিমানা করেছি। আসলে জরিমানা তো বিষয় নয়, সচেতনতা বৃদ্ধি হচ্ছে কি-না সেটাই বিষয়। আমাদের নিয়মিত অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে মাস্ক বিতরণ করা হচ্ছে।

রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন জেলায়ও মাস্ক পরিধানের বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে অভিযান অব্যাহত আছে। তবে দেখা গেছে, রাজধানীর বাইরে মাস্ক ব্যবহারের প্রবণতা তুলনায় কম।

রাজধানীর কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর, শাহবাগ, রামপুরা ও বাড্ডা এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পথচারী থেকে শুরু করে বাসের যাত্রীরা মাস্ক ব্যবহার করছেন। তবে তাদের মধ্যে কারও কারও মুখের মাস্ক থুতনিতে আছে। কেউ পকেটে রেখেছেন। তবে বাসে উঠলেই হেলপার মাস্ক পরতে বলছেন। আবার মাস্ক পরিহিত যাত্রীটি পাশে বসা আরেক যাত্রীকে মাস্ক পরতে অনুরোধ করছেন। যদিও সবার কাছেই মাস্ক রয়েছে।

এদিকে নিয়মিত মসজিদগুলোতে মাস্ক পরে আসার জন্য মাইকিং করা হচ্ছে। কেউ অসুস্থ থাকলে মসজিদে না আসার জন্যও অনুরোধ করা হয়। মসজিদের একাধিক মুসল্লির সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, মাস্ক পরতে হবে নিজেদের নিরাপদের জন্য। তারপরও কেউ কেউ ভুলে যান। এজন্য আমাদের একে-অপরের উচিত হবে মাস্ক ব্যবহারের জন্য অনুরোধ করা।

কারওয়ান বাজার ও পল্টন এলাকার একাধিক খুচরা ও পাইকারি মাস্ক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা হয় জয়বাংলানিউজের। তারা বলেন, এখন বাজারে মাস্কের চাহিদা রয়েছে, আবার সংকটও নেই। তবে হঠাৎ করে দাম বেড়ে গেলে বেচা-কেনা তেমন ভালো হয় না। এখন যে মাস্কের ব্যবহার বাড়ছে তার কারণ হলো- সরকারের নির্দেশনার সঙ্গে এই শীতে মানুষের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ভয় রয়েছে। আসলে রাস্তায় বের হলে মাস্ক পরতে হয় এই ভেবে এখন মাস্ক কিনছে। বলা যায়, আগের চেয়ে মানুষের মাঝে মাস্ক ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে।

মাস্ক বিক্রেতা হোসেন আলী বলেন, আমাদের দেশে সবাই সবকিছুতে অভ্যস্ত হতে পারে। দাম বাড়লেও কিনবে। আবার সরকার রাস্তায় অভিযান চালালে সবাই মাস্ক পরবে। শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাস্কের বিক্রি কিছুটা বেড়েছে।

বাসযাত্রী মোহাম্মদ সিতার বললেন, করোনার জন্য মাস্ক তো পরতেই হবে। এছাড়া ঢাকায় যে ধুলাবালি এজন্যও মাস্ক ব্যবহার করা প্রয়োজন। তারপরও কেউ কেউ দেখি উদাসীন। তবে আগের চেয়ে মানুষ মাস্ক বেশি ব্যবহার করে।

এ বিষয়ে কথা হয় বেসরকারি চাকরিজীবী আদনান রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, মাস্কের ব্যবহার ও দাম এ দুটোই বেড়েছে। কিন্তু মানুষ মাস্ক ব্যবহার করছে। এর পেছনের কারণ হলো- শীতে করোনায় আক্রান্ত হতে পারে এই ভয়ে। এছাড়া মাস্ক ছাড়া রাস্তায় বের হলে জরিমানা গুনতে হবে।

করোনা সংক্রমণের শুরু থেকেই শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপ আরএফএলের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান গেটওয়েল লিমিটেড সার্জিক্যাল মাস্ক তৈরি করছে। গেটওয়েল লিমিটেডের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল জয়বাংলানিউজকে বলেন, আমরা ২০১৫ সালে হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের নিজস্ব কারখানায় সার্জিক্যাল মাস্ক উৎপাদন শুরু করি। করোনার আগে মাস্কের ব্যবহার তেমন ছিল না বললেই চলে। হাসপাতাল কিংবা কারখানাগুলোতে এর ব্যবহার ছিল। কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রভাবে মাস্কের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এ কারণে গেটওয়েল বাজারে চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়েছে। করোনাভাইরাস শুরুর আগে গেটওয়েল প্রতিদিন ১৫ হাজার পিস মাস্ক উৎপাদন করতো। এখন সেই উৎপাদন প্রতিদিন আড়াই লাখ পিসে দাঁড়িয়েছে। আগামী বছরের শুরুতে মাস্ক উৎপাদন সাড়ে তিন লাখ পিসে বেড়ে দাঁড়াবে। আমাদের মাস্কের কাঁচামাল চীন থেকে আসে।

তিনি জানান, গেটওয়েল লিমিটেড শিগগির কেএন-৯৫ মাস্ক তৈরির পরিকল্পনা করছে, যা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রফতানি সম্ভব হবে।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ জয়বাংলানিউজকে বলেন, আমার দৃষ্টিতে মাস্ক ব্যবহার তো সায়েন্টিফিক। এটা কোনো পলিটিক্যাল সিদ্ধান্ত নয়। এটা একটা বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত, সারা বিশ্বব্যাপী এটা সবারই মানা উচিত। তবে আমাদের এখানে দুর্বলতা আছে। সেটা হলো- এই মানার জন্য আইনগত একটা ভিত্তি থাকলে সুবিধা হয়। এই সাজেশন অনেকে নাও মানতে পারেন। আপনাকে সবজি খেতে বললো আপনি খেলেন না, এটা তো আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু আপনাকে মাস্ক পরার ক্ষেত্রে আইনি একটা বাধ্যবাধকতা আছে, সে বাধ্যবাধকতা সরকার সঠিকভাবে ইমপোজ করতে পারেনি, এখানে এখনো দুর্বলতা আছে।

মাস্ক ব্যবহারের বিষয়ে এই আইনজীবী আরও বলেন, অবশ্যই সবাইকে মাস্ক পরতে হবে। এটার কোনো বিকল্প তো এখন পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেনি। যদি ভাইরাস থেকে নিরাপদ থাকতে হয় তাহলে মাস্কের বিকল্প নেই। আর ভ্যাকসিন এলে সেক্ষেত্রে ভিন্ন কথা। তবে এখন আমি বলবো, সব লোকই এই মাস্কটা যেন পরে। মাস্ক পরার মাধ্যমে ব্যক্তির মানবাধিকারই রক্ষা হবে। আমাদের যে বেঁচে থাকার অধিকার সেটা মাস্ক পরিধানের মাধ্যমে রক্ষা করার সুযোগ আছে।