বিআইডব্লিউটিএ ড্রেজিং প্রকল্প সেক্টরে নিরব বিপ্লব

উত্তোলনকৃত মাটি এখন কৃষি জমি, উৎপাদন হচ্ছে লাভজনক ফসল , প্রাণ পেয়েছে ২০০০ কিলোমিটার নৌপথ

99
মগড়া নদীর মদন উপজেলার পাহাড়পুর প্রাথমিক বিদ্যালয় ড্রেজার দিয়ে মাটি ভরাট করা হচ্ছে জয়বাংলানিউজ

সারাদেশে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীন নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ড্রেজিং প্রকল্প সেক্টরে নিরব বিপ্লব ঘটতে চলেছে। ইতোমধ্যে বরিশাল-পটুয়াখালী নৌরুটসহ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নৌযান চলাচলের উন্মুক্ত করা হয়েছে। করা হয়েছে নদী খননে উত্তোলনকৃত মাটি দিয়ে ৫ হাজার একর অকৃষি জমিকে কৃষি জমিতে রূপান্তর। চলতি মৌসুমে বিভিন্ন স্থানে এ জমিতে বোরো ধান, রোপা আমন ও সরিষাসহ বিভিন্ন ধরনের সবজির চাষ হচ্ছে।

গড়ে প্রতি একর জমিতে ছয় মেট্রিক টন সবজি উৎপাদিত হয়। এ হিসেবে ৫ একরে সবজি উৎপাদন হয় ৩০ হাজার মেট্রিক টন। প্রতি মেট্রিক টন সবজির বাজারমূল্য ১৫ হাজার টাকা হলে সে হিসাবে প্রায় ৪৫ কোটি টাকার সবজি উৎপাদিত হবে। এছাড়া প্রতি কেজি বোরো ধান উৎপাদন করতে মাটির প্রকারভেদে ৩ থেকে ৫ হাজার লিটার পানির প্রয়োজন হয়। এই বিপুল পরিমাণ পানির সবটাই কি ধান গাছের জন্য অপরিহার্য। বিআইডব্লিউটিএ ড্রেজিং করা ২৪টি নদী থেকেই এই সেচের চাহিদা পূরণ করা হয় বলে কৃষি বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

এ বিষয়ে কৃষিবিদ ড. মো. মশিউর রহমান বলেছেন, শুকনা পদ্ধতিতে বোরো ধান উৎপাদন এমন একটি প্রযুক্তি যাতে জমি কাদা করতে হয়। জো অবস্থার মাটি বা শুকনা মাটিকে চাষ দিয়ে সরাসরি লাইনে বীজ বোনা হয়। কাইছথোড় পর্যন্ত মাটিতে কেবল রস থাকলেই চলে-দাঁড়ানো পানির দরকার হয় না। তবে কাইচথোড়ের পর থেকে ফুল আসা পর্যন্ত জমিতে ছিপছিপে ৩-৫ সেমি পানি রাখতে হয়। শুকনা জমির পাশে নদী থাকে তাহলে খুব ভালো হয়। দ্রুত সেচের ব্যবস্থা করা যায়। তাতে শতকরা ৫০ ভাগেরও বেশি পানি সাশ্রয় হয় বলে তিনি জানান।

অকৃষি জমিকে কৃষি জমি তৈরির পাশাপাশি ৫০০টি ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিচু স্থান, খেলার মাঠ, ঈদগা, স্টেডিয়াম, কবরস্থান, গির্জা-মন্দির তীর্থস্থান ড্রজিং এর মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পের আওতায় মংলা-ঘষিয়াখালী ( এমজি) চ্যানেল, লাউকাঠি, ভোলা নালা, কীর্তনখোলা, ইছামতি, কর্নতলী,সুরমা, রক্তি বাউলাই, রক্সা নীলা, কংস নদীসহ ২৪টি নৌরুটে ৩১টি ড্রেজার ড্রেজিং কাজে নিয়োজিত থেকে মৃতনদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা হয়েছে ২ হাজার কিলোমিটার নৌপথ।

নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার ভরাট হওয়া কংস নদী ড্রেজিং করা হচ্ছে।

হাওর অঞ্চলে ১০ কিলোমিটার নিচু জায়গা ভরাট করে গবাদি পশু পালন ও স্থানীয় বাসিন্দারের বসবাসের উপযোগী করা হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় নৌরুটের ১২ হাজার কিলোমিটার নৌপথ খননের জন্য প্রথম পর্যায় ২৪টি নদী খনন প্রকল্পের আওতায় এই নৌপথ উদ্ধার করা হয়। ১ হাজার ৯২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পের মাধ্যমে ৯৯৭ লাখ ঘনমিটার মাটি অপসারণ করে ২ হাজার ৩৮৬ কিলোমিটার নৌপথ উদ্ধার করা হবে বলে নৌপরিহন মন্ত্রণালয়ের অধিন বিআইডব্লিউটিএ ও অনুসন্ধানে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, সারাদেশে অভ্যন্তরীণ নৌপথের ৫৩টি রুটে ক্যাপিটাল ড্রেজিং ২য় সংশোধিত প্রকল্পের আওতায় ২০১১ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া মোংলা-ঘষিয়াখালী (এমজি) চ্যানেল ড্রেজিং করে ২০১৫ সালে নৌযান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ড্রেজিং এর আগে এমজি চ্যানেলে সমুদ্রে জোয়ারের সময় ৩ থেকে ৪ ফুট গভীরতা থাকতো। জোয়ার চলে গেলে চ্যানেলে পানি থাকতো না। এ সময় কোন প্রকার কোন মালবাহি জাহাজ চলাচল করতে পারে না। বর্তমানে খননের পর এই চ্যানেল দিয়ে বর্তমানে ১ লাখ ৩৯ হাজার টি ভেসেল (বড় জাহাজ) ৮-১৪ ফুট গভীরতায় চলাচল করছে। এ চ্যানেলে সর্বনিম্ন ১২ ফুট এবং জোয়াড়ের সময় ২০ ফুট পর্যন্ত গভীরতা থাকে এবং প্রস্থ ২০০-৩০০ ফুট রয়েছে।

নাব্যতা সংকটে খাগদোন, লাউকাঠি, ভোলা নালা, কীর্তনখোলা, ইছামতি, কর্নতলী, সুরমা, রক্তি বাউলাই, রক্সা নীলা এবং কংস নদী এই প্রকল্পে আওতায় ড্রেজিং এর নাব্যতা ফিরিয়ে এনে এখন সারাবছর চলাচল করছে নৌযান। ভৈরব-ছাতক নৌপথে শুকনা মৌসুমে হাফলোড (অর্ধবোঝাই) দিয়ে কার্গো চলাচল করত। এই নৌরুটে ড্রেজিং পর সারাবছর ফুললোডে কার্গো চলাচল করছে।

খুলনা-নোয়াপাড়া নৌপথে প্রকট নাব্যতা সংকট ছিল, জোয়াড়ের সুবিধা ছাড়া এ গুরুত্ব রুট দিয়ে কার্গো চলাচল করতে পারত না। প্রকল্পের আওতায় ড্রেজিং-এর পর সার্বক্ষণিক কার্গো জাহাজ চলাচল করছে। মৃত বা মৃত প্রায় গাগলাজোড়- মোহনগঞ্জ, আনোয়ারপুর-তাহেরপুর, বরিশাল-পটুয়াখালী নৌপথের সাহেবেরহাট নালা ড্রেজিং করে নৌযান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।

খুলনার নোয়াপাড়া বাসিন্দা মো. বাদল মিয়ার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, প্রকল্পের ড্রেজিংয়ের মাটি দ্বারা পতিত ও নিচু জমি ভরাট করে প্রায় ৫ হাজার একর অকৃষি জমিকে কৃষি জমিতে রূপান্তর করা হয়েছে। ড্রেজিংয়ের মাটি দ্বারা ৫০০টির মতো শিক্ষা-ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এর নিচু জায়গা ভরাট করা হয়েছে।

তাহেরপুর বাসিন্দা আয়নাল ফকির বলেন, হাওর অঞ্চলের তাহেরপুর, বিশ্বম্বপুর, মদন, নিকলি, গাগলাজোড়-ধর্মপাশা-মোহনগঞ্জ, বাঞ্ছারামপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১০ কিলোমিটার নিচু জায়গা ভরাট করে গ্রামের গরিব মানুষ ও গবাদি পশুর বসবাসের জায়গার ব্যবস্থা করে দিয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিআইডব্লিউটিএ।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি ২০১২ সালে একনেক অনুমোদিত হওয়ার পর একই বছরে জুলাই ড্রেজিং এর কাজ শুরু হয়। চলতি বছর জুনে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। প্রকল্পের আওতায় ২৪টি নৌপথে মোট ৯৯৭ লাখ ঘনমিটার মাটি খনন করা হবে। চলতি অর্থবছরে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।

এর মধ্যে বেসরকারি ড্রেজার দ্বারা ৬৭৩ দশমিক ৫৮ লাখ ঘনমিটার, বিআইডব্লিউটিএ’র নিজস্ব ড্রেজার দ্বারা ৮৮ দশমিক ৬০ লাখ ঘনমিটার এবং এক্সকাভেটর দ্বারা ৪৭ দশমিক ৩১ লাখ ঘনমিটার অর্থাৎ সর্বমোট ৮০৯ দশমিক ৪৯ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিং করে ২ হাজার কিলোমিটার নৌপথ নাব্য করা হয়েছে।

২৪টি নৌ-রুটেরমধ্যে ১৪টি রুটের কাজ সমাপ্ত এবং ১০টি কাজ চলমান রয়েছে। তন্মধ্যে ৪টি রুটের অগ্রগতি ৮৫ শতাংশ এর উর্দ্ধে এবং ৩টি রুটের ৬০ শতাংশ এর মধ্যে এবং ৩টি রুটের ৪০ শতাংশ এর মধ্যে। প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি চলতি বছর মে মাস পর্যন্ত ৮৩ শতাংশ। মোট ব্যয় ধার্য্য করা হয়েছে ১২৯৪.৪৯ কোটি টাকা। বর্তমানে ১০টি রুটে ৩৩টি ড্রেজার ড্রেজিংকাজে নিয়োজিত রয়েছে বলে বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়।

নরসিংদীর বেলাবো বাসিন্দা মো. আনোয়ার শিকদার বলেন, প্রকল্পের মাধ্যমে উত্তোলনকৃত মাটি দিয়ে নরসিংদী বেলাবো’র ভাওয়ালের চর সরকারি প্রাঃ বিদ্যালয়ের, টেকপারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাধাখালি জুনিয়র উচ্চ বিদ্যালয়, পোড়াদিয়া বাজারের পূর্ব পাশের সরকারি খাস জমি, উত্তর পোড়াদিয়া ব্রিজ জামে মসজিদ, পোড়াদিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ প্রায় ৫০০টি ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিচু স্থান ভরাট করা হয়েছে।

এ বিষয়ে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী জয়বাংলানিউজকে বলেছেন, দেশের দক্ষিণাঞ্চলে পরিবহনের প্রধান মাধ্যম নৌপথ। মোংলা বন্দরের ব্যবহার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি এবং পায়রা বন্দরের উন্নয়নের কারণে এ অঞ্চলটির নৌপথ ব্যবহারে নদীসমূহের গুরুত্ব অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।

তিনি বলেন, বরিশাল বিভাগের ৩১টি নৌপথের নাব্যতা এবং অন্যান্য সুবিধা বৃদ্ধি করে টেকসই ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হবে। তিনি বলেন, শুধু রাজধানী নয়, পর্যায়ক্রমে দেশের সব নদী অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে মুক্ত করা হবে। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে নদীর অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ অভিযান চলছে। পর্যায়ক্রমে দেশের সব নদীর অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হবে। সারাদেশে বিভিন্ন নদীর ৬০ হাজার অবৈধ দখলদার রয়েছে। তাদের মধ্যে ইতিমধ্যে ২০ হাজার অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করা হয়েছে বলেও প্রতিমন্ত্রী জানান।