ব্যাংক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসে জড়িত আরও ১৫ জন: ডিবি

7

পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মকর্তা (ক্যাশ) পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসে আরও ১৫ জনের জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। রিমান্ডে থাকা তিন ব্যাংক কর্মকর্তাসহ ছয়জনকে জিজ্ঞাসাবাদে এই তথ্য পেয়েছে বলে জানিয়েছে ডিবি।

শুক্রবার (১২ নভেম্বর) রাতে তেজগাঁও জোনাল টিমের টিম লিডার অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মো. শাহদাত হোসেন সোমা এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, গ্রেফতার আসামিরা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন- নিয়োগ পরীক্ষার দিন সকালে স্থাপন করা বুথে আরও ১৫ জন ব্যক্তি নিয়োগ প্রত্যাশীদের এমসিকিউ পদ্ধতির প্রশ্ন ও উত্তর মুখস্থ করিয়েছিলেন। তাদের নাম-ঠিকানা পাওয়া গেছে। এখন তাদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। গ্রেফতারের পর তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।

এর আগে, সম্প্রতি ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটির আওতায় পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস হয়। একটি পরীক্ষায় ডিবি পুলিশের সদস্যরা ছদ্মবেশ ধারণ করে প্রশ্নফাঁস চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করে। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে ডিবি বলছে, ব্যাংকের পরপর চারটি নিয়োগ পরীক্ষায়ই প্রশ্নফাঁস করেছে চক্রটি। আর চক্রে জড়িত ও গ্রেফতারদের তিনজনই সরকারি বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তা।

ডিবির প্রাথমিক তদন্তে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। জড়িত সরকারি ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে প্রশ্নপত্র প্রণয়নসহ পরীক্ষা আয়োজনের দায়িত্বপ্রাপ্ত আহছানউল্লা ইউনির্ভাসিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির আইসিটি বিভাগ থেকে প্রশ্নফাঁস হয়। এ পর্যন্ত চক্রটি প্রশ্ন ও উত্তরপত্র ফাঁসের মাধ্যমে চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে ৬০ কোটি টাকা।

গত ৬ নভেম্বর থেকে বুধবার (১০ নভেম্বর) পর্যন্ত বিশেষ অভিযান চালিয়ে প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় জড়িত পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতাররা হলেন- মূলহোতা আহছানউল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি টেকনিশিয়ান মোক্তারুজ্জামান রয়েল (২৬), জনতা ব্যাংকের গুলশান শাখার কর্মকর্তা শামসুল হক শ্যামল (৩৪), রূপালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার জানে আলম মিলন (৩০), পূবালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার মোস্তাফিজুর রহমান মিলন (৩৮) ও পরীক্ষার্থী স্বপন।

এরপর বৃহস্পতিবার (১১ নভেম্বর) প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে জনতা ব্যাংকের সিনিয়র অফিসারসহ আরও তিনজনকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) তেজগাঁও বিভাগ। গ্রেফতাররা হলেন- জনতা ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার এমদাদুল হক খোকন, সোহেল রানা ও ঢাকা কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী এবি জাহিদ।

ডিবি সূত্রে জানা যায়, পাঁচটি ব্যাংকের এক হাজার ৫১১টি অফিসার (ক্যাশ) শূন্যপদের নিয়োগ পরীক্ষা গত ৬ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকে ১৮৩টি, জনতা ব্যাংকে ৫১৬টি, অগ্রণী ব্যাংকে ৫০০টি, রূপালী ব্যাংকে ৫টি ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে ৭টি পদ রয়েছে। বিকেল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত ঢাকার বিভিন্ন কেন্দ্রে এমসিকিউ পদ্ধতিতে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকার সিলেকশন কমিটির মাধ্যমে প্রশ্নপত্র তৈরি ও পুরো পরীক্ষা সম্পাদনের দায়িত্বে ছিল আহছানউল্লা ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলোজি।

দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্নফাঁস রোধে কাজ করা ডিবির তেজগাঁও বিভাগের তেজগাঁও জোনাল টিমের কাছে গত ৫ নভেম্বর রাতে পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস হবে- এমন তথ্য আসে। এরপর ডিবির টিম ছদ্মবেশে পরীক্ষার্থী সেজে পরীক্ষার দিন (৬ নভেম্বর) সকাল ৭টায় প্রশ্নপত্রসহ উত্তর পাওয়ার জন্য চক্রের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। চক্রটিকে অগ্রিম টাকা দেওয়া হলে ওই চক্রের অন্যতম হোতা রাইসুল ইসলাম স্বপন (৩৬) পরীক্ষার্থীকে সঙ্গে নিয়ে যান। এরপর পরীক্ষার উত্তরপত্রসহ স্বপনকে হাতেনাতে আটক করা হয়।

গত ৬ নভেম্বর পরীক্ষায় আসা প্রশ্নের সঙ্গে সকালে পাওয়া প্রশ্ন ও উত্তর হুবহু মিলে যায়। এরপর স্বপনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রূপালী ব্যাংকের সাভার শাখার শ্রীনগর থেকে জানে আলম মিলনকে গ্রেফতার করা হয়।

রূপালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার জানে আলম মিলনের তথ্যের ভিত্তিতে দিনাজপুরের পার্বতীপুরে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে জানা যায়, প্রশ্ন ও উত্তরপত্র সরবরাহকারী শামসুল হক শ্যামল ঢাকায় অবস্থান করছেন। পরে ঢাকার দক্ষিণ বাড্ডা থেকে শামসুল হক শ্যামলকে (৩৪) গ্রেফতার করা হয়।

শামসুল হক শ্যামলকে জিজ্ঞাসাবাদে প্রশ্নফাঁসের কথা স্বীকার করেন। তার দেওয়া তথ্যে চক্রের মূল হোতা মুক্তারুজ্জামান রয়েলকে (২৬) বাড্ডার আলিফনগর থেকে গ্রেফতার করা হয়। মুক্তারুজ্জামান আহছানউল্লা ইউনিভার্সিটির আইসিটি টেকনিশিয়ান (হ্যার্ডওয়ার ও সফটওয়ার) হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত অন্য সহযোগীদের সহায়তায় পরীক্ষার প্রশ্ন ও উত্তরপত্র সংগ্রহ করেছেন বলে স্বীকার করেছেন।

গ্রেফতারদের দেওয়া তথ্য, তাদের মোবাইল ফোনে থাকা তথ্য ও হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটের তথ্য যাচাই করা হয়। এর ভিত্তিতে রাজধানীর লালবাগ থেকে প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র ফাঁস চক্রের অন্যতম হোতা পূবালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার মোস্তাফিজুর রহমান মিলনকে গ্রেফতার করা হয়।

প্রশ্নফাঁস সম্পর্কে ডিবি পুলিশের এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, পরীক্ষার আগে চক্রের সদস্যরা রাজধানীর বাড্ডা, বসুন্ধরা, উত্তরা, মোহাম্মদপুর, কল্যাণপুর, রূপনগর, মিরপুর, মাতুয়াইল, শেওড়াপাড়া, শেরেবাংলা নগর, পল্লবী এলাকায় বুথ বসায়। ওই সব জায়গায় পরীক্ষার ৫-৬ ঘণ্টা আগে নিজস্ব লোকের মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের ফাঁস করা প্রশ্ন ও উত্তরপত্র মুখস্থ করানো হয়। চক্রের সদস্যদের তত্ত্বাবধানে প্রত্যেক বুথে ২০-৩০ জন পরীক্ষার্থী ওই পরীক্ষার প্রশ্ন ও উত্তর মুখস্থ করিয়ে কেন্দ্রে পাঠান।

আসামি মুক্তারুজ্জামান ও শ্যামল জানান, সুকৌশলে তারা এর আগে আরও তিনটি বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস করেছেন। শ্যামন জানান, এই চক্র পরীক্ষার ৫-৬ ঘণ্টা আগেই বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে প্রায় দুই হাজার পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ওই পরীক্ষার প্রশ্ন ও উত্তর সরবরাহ করেছেন। প্রত্যেক পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে নিয়োগ পাওয়ার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে পাঁচ থেকে ১৫ লাখ টাকা নেওয়া হয়। এমসিকিউ পরীক্ষার আগে ২০ শতাংশ, লিখিত পরীক্ষার আগে আরও ২০ শতাংশ ও নিয়োগ পাওয়ার পর বাকি ৬০ শতাংশ টাকা পরিশোধের শর্তে পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে চুক্তি করে টাকা নেওয়া হতো।

গত ৬ নভেম্বর দুপুর ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচ ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এক হাজার ৫১১টি পদের বিপরীতে পরীক্ষায় অংশ নেন এক লাখ ১৬ হাজার ৪২৭ জন।