মা-সন্তানের দেখা হলোনা চক্ষু মেলিয়া

18

মো. সুজন মোল্লা
দশ মাস ১০ দিন গর্ভে ধারণ করেছে যে সন্তানকে। সেই সন্তান পৃথিবীর আলোতে আসার পরে মায়ের সাথে দেখা হয়নি চক্ষু মেলিয়া। এমনকি জনমদুখী মায়ের একফোটা দুধও পান করতে পারেনি সন্তান। ভূমিষ্ঠ হওয়ার প্রায় ৫ মিনিটেন মধ্যে বিচিত্র এই অভিনয়শালা থেকে বিদায় নেন মা। সন্তান তখন দাদীর কোলে। সিজারিয়ান অপারেশন করার সাথে সাথেই সন্তানকে বের করে আনা হয় ওটি রুম থেকে। কেননা তার মা বেজায় অসুস্থ। এমনই এক হৃদয় বিদারক ঘটনা ঘটে গেলো বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অপারেশন থিয়েটারে। প্রসূতির নাম লাভলি বেগম (২৫)। স্বামী জসিম হাওলাদার পেশায় একজন ভ্যানচালক। বাড়ি চাখার ইউনিয়নের বড় ভৈৎসর গ্রামে।

বৃহস্পতিবার (৯ সেপ্টেম্বর) বানারীপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রসূতি স্ত্রীকে নিয়ে আসেন জসিম। ওই সময় পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা কবির হাসান রোগীকে দেখে নির্ধারিত একটি ডায়গনস্টিক সেন্টারের নাম বলে সেখান থেকে বিভিন্ন ধরনের টেস্ট দিয়ে পরীক্ষা করানোর কথা বলে ভর্তি হতে বলেন।

শনিবার (১১সেপ্টেম্বর) সকালে লাভলি বেগমকে এক নার্স এসে বলেন আজ আপনার সিজারিয়ান অপারেশন করা হবে। স্বামী ভ্যানচালক জসিমকে ঔষুধ নিয়ে আসতে বললে জসিম চলে যান ফার্মেসীতে। স্বামীর আসতে একটু দেরী হচ্ছে দেখে স্ত্রী লাভলি তাকে খুঁজতে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দোতলা থেকে হেটে নিচে আসেন। তখন সম্পূর্ণ সুস্থ ছিণেন প্রসূতি লাভলী বেগম।

তার কিছু সময় পরই তাকে নেয়া হয় অপারেশন থিয়েটারে। স্বামী ও অন্যান্য স্বজনদের সাথে ওটাই ছিলো লাভলির শেষ দেখা। অপারেশন শেষে এক সেবিকা সদ্যজাত সন্তানকে দাদীর কোলে দিয়ে বলেন মায়ের অবস্থা ভাল না। ৪/৫ মিনিট পরে জানানো হয় প্রসূতি আর বেঁচে নেই। এ যেন, বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো অবস্থা স্বামী ও স্বজনদের। এমনটাই জানালেন লাভলির স্বামী জসিম হাওলাদার।

তিনি আরও বলেন, স্ত্রী মারা যাওয়ার সাথে সাথেই তারাহুরো করে কোন ধরনের ছাড়পত্র না দিয়েই তাদেরকে সরকারী এম্বুলেন্সে করে লাশ নিয়ে পাঠিয়ে দেয়া হয় বাড়িতে। মৃত লাভলির ভাই মোঃ বাবলু বলেন তাদেরকে হাসপাতাল থেকে এক প্রকার জোর করেই পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাক্তার এস এম কবির হাসান বানারীপাড়া প্রেসক্লাবকে বলেন, প্রসূতি লাভলি বেগমকে আরো এক মাস পূর্বে হাসপাতালে ভর্তির জন্য বলা হয়েছিল কিন্তু ভর্তি করায়নি। তবে শনিবার লাভলির অপারেশন হওয়ার পরে তার রক্তচাপ বেড়ে যায় এক পর্যায়ে তার হার্ট এ্যাটাক হয়। আমাদের সকল ধরণের চেস্টা ব্যর্থ হয়ে তার মৃত্যু হয়।

রোববার (১২ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯ টায় হতভাগী লাভলির লাশ দাফন করা হয়েছে।

এ বিষয়ে বরিশাল সিভিল সার্জন ডাক্তার মোঃ মনোয়ার হোসেন জানান,যদি সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের অবহেলায় প্রসূতি মারা যায় এমন অভিযোগ পেলে অবশ্যই তদন্ত পূর্বক আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে সদ্যজাত সন্তানকে কোলে করে মায়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকছে অসহায় পিতা জসিম হাওলাদার। যে দৃশ্য নিজ চোখে না দেখলে আজব এই অর্থের পৃথিবীকে চেনা-জানা অনার্থকই থেকে যাবে।