লকডাউনের অষ্টম দিন : অতিষ্ঠ রাজধানীবাসীর হাজারো প্রশ্ন

56

দেশজুড়ে চলমান সর্বাত্মক কঠোর লকডাউনের অষ্টম দিন আজ। এই ৮ দিনেই হাফিয়ে উঠেছেন রাজধানীবাসী। তারা আর পারছেন না। ঘরে বসে থাকতে থাকতে খাবারও শেষ। কেউ তাদের খবরও নেয়নি। এবার ফের রাস্তায় বেড়োনোর পালা আর সেটাই করলেন রাজধানীবাসী।

অথচ গতকাল বুধবার (৭জুলাই) ছিল একদিনে রেকর্ড ২ শতাধিক মৃত্যুর খবর। সেটি উপেক্ষা করে আজ ঢাকার রাস্তায় যানবাহন ও মানুষের সরব উপস্থিতি দেখা গেছে। তবে পথে যারা বের হয়েছেন তারা বলছেন, বাধ্য হয়েই বের হতে হয়েছে তাদের।

রাজধানী দক্ষিনগাওয়ের চাল ব্যবসায়ী মনির হোসেন। তিনি জয়বাংলানিউজকে বলেন, “ভাই গতকাল (বুধবার) জনৈক এক রিকসা চালককে দেখেছি সকালে রিক্সা নিয়ে বের হয়ে একটি হোটেলে এসে পাঁচ টাকা দিয়ে বলল ভাই একটা পরাটা দেন। তখন দোকানি বলল শুধু একটা পরাটা? কী দিয়ে খাবেন? তখন রিক্সা চালক বলল, আমার কাছে আর পয়সা নাই। যদি একটু পারেন ভাজি দিয়েন; না হলে নাই। হোটেলওয়ালা একটু ভাজি দিলেন। পরে তা দিয়ে একটি পরাটা খেয়ে বেরিয়ে পরলেন।”

এটাই রাজধানীর অনেক পরিবারের বাস্তবতা! যা কেউ দেখে না। জয়বাংলানিউজ.কম.বিডির কাছে অনেকের প্রশ্ন, বলেন কে কখন সরকারি সাহায্য পেয়েছে? কী-তে জানি ফোন করলে খাবার আসে? কোথাও কেউ সে খাবার পেয়েছে বলে আজও শুনি নাই। ঈদের সময় যারা সরকারি দল করে শুধু তারাই মোবাইলে টাকা পেয়েছে। আর কেউ কী পেয়েছে?

আজ (বৃহস্পতিবার) সকালে রাজধানীর বাসাবো, কদমতলা, খিলগাও, রামপুরা, মালিবাগ, গুলশান, বাড্ডা, কুড়িল বিশ্বরোড এলাকা ঘুরে দেখে গেছে, গণপরিবহন না চললেও আগের দিনগুলোর তুলনায় সড়কে মানুষ, রিকশা, যানবহন অনেক বেড়েছে। রাস্তায় মানুষের সংখ্যা লকডাউনের প্রথম সাতদিনের চেয়ে বেশি। মানুষের সঙ্গে ব্যক্তিগত গাড়ি, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, পিকআপ চলাচলও বেড়েছে।

গতকাল বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদফতর জানায়, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত একদিনে দেশে আরও ২০১ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা দেশে এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড।

এদিকে লকডাউনে মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণে রাস্তায় গতকাল কঠোর অবস্থানে ছিল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সরকারের দেওয়া কঠোর বিধিনিষেধ (লকডাউন) অমান্য করায় গতকাল এক দিনে রেকর্ড এক হাজার ১০২ জনকে গ্রেফতার করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। পাশাপাশি ডিএমপি পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত ২৪৫ জনকে এক লাখ ৭১ হাজার ৯৮০ টাকা জরিমানা করে।

৮০৪টি গাড়িকে ১৮ লাখ ৬৮ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়। তবুও কেন সড়কে মানুষের উপস্থিতি কমছে না? এ বিষয়ে অষ্টম দিনের লকডাউনে বাইরে বের হওয়া একাধিক সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা হলে তারা তাদের নিজেদের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।

রাজধানীর গুলশানের রাস্তায় কথা হয় সাজ্জাদুল ইসলাম নামে  একজন বেসরকারি চাকরিজীবীর সঙ্গে। তিনি বলেন, করোনা সংক্রমণের হার, মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। এদিকে বাইরে বের হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মামলা। তবুও আমরা বাইরে বের হয়েছি। কিন্তু এই বের হওয়া তো আমরা শখ করে বের হয়নি। জীবিকার তাগিদেই আমাদের মতো সাধারণ মানুষকে বের হতে হয়েছে। লকডাউন তবুও অফিস খোলা কেন? মানুষের ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত না কেন? তাহলে আপনি শুধু লকডাউনের ডাক দিয়েই পালনের নির্দেশ দেবেন? আর আমরা তাহলে খাবো কী, এর দায়িত্ব কে নেবে?

প্রগতি সরণিতে কথা হয় আরেক পথচারী আকরাম হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, সামনে আমার ইলিকট্রনিক দোকান। দোকান খুললেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এসে গাল মন্দ করে, দোকান বন্ধ করে দেয়। এই দোকান থেকেই তো আমার জীবিকা, তাই এসেছি, দোকানের শাটার অর্ধেক খুলে রাখবো। যদি বেচাকেনা হয়, সেটাই আমার জীবিকা। কয়দিন দোকান বন্ধ রেখে গোছানো টাকা ভেঙে খাবো? তাই বাইরে এসেছি যদি কোনোভাবে একটু দোকান খোলা যায়। করোনার ভয় তো আমাদেরও আছে, আমরাও ভয় করি, কিন্তু ভয়ে বসে থাকলে খাবো কী? যে কারণে আমাদের মতো সাধারণ কর্মজীবী, ছোট ব্যবসায়ীরা করোনার ভয় রেখেই বাধ্য হয়ে জীবিকার তাগিদে বাইরে বের হয়েছি।