হিরো তাইজুলের ৭ উইকেট, ৪৪ রানের লিড পেলো বাংলাদেশ

41

পাকিস্তানের দুই ওপেনারের ব্যাটিংয়ে মনে হচ্ছিল, বিশাল লিডের নিচে চাপা পড়তে হবে বাংলাদেশকে। শনিবার ম্যাচের দ্বিতীয় দিন উদ্বোধনী জুটিতেই ১৪৫ রান করে ফেলেছিল পাকিস্তান। সেখান থেকে আজ আর ১৪১ রান যোগ করতেই ১০ উইকেট হারিয়েছে তারা। ফলে উল্টো ৪৪ রানের লিড পেয়েছে স্বাগতিক বাংলাদেশ।

দলকে লিড এনে দেওয়ার মূল কারিগর বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম। ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় সেরা বোলিংয়ের রেকর্ড গড়ে ১১৬ রানে ৭ উইকেট নিয়েছেন তাইজুল। তার স্পিনে কুপোকাত হয়ে পাকিস্তানের ইনিংস থেমেছে ২৮৬ রানে। আবিদ আলি হাঁকিয়েছেন সেঞ্চুরি, ফিফটি করেছেন আরেক ওপেনার আব্দুল্লাহ শফিক। আর কেউই পঞ্চাশের দেখা পাননি।

শনিবার ম্যাচের দ্বিতীয় দিন পাক্কা দুই সেশন বোলিং করেও পাকিস্তানের উদ্বোধনী জুটি ভাঙতে পারেনি বাংলাদেশ দল। তবে তৃতীয় দিন অর্থাৎ রোববার দিনের প্রথম ওভারেই জোড়া সাফল্য তুলে নেন বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম। পরপর দুই বলে সাজঘরে ফেরান অভিষিক্ত ওপেনার আব্দুল্লাহ শফিক ও আজহার আলিকে।

আগেরদিন করা বিনা উইকেটে ১৪৫ রান নিয়ে খেলতে নেমেছিল পাকিস্তান। দিনের প্রথম বলেই এক রান নিয়ে শফিককে স্ট্রাইক দেন আবিদ আলি। পরপর তিন বল ডট খেলেন শফিক। ওভারের পঞ্চম বলে করতে চেয়েছিলেন স্কয়ার কাট।

কিন্তু তার সেই শটটিতে বল ব্যাটে লাগার আগে আঘাত হানে প্যাডে। বাংলাদেশের ফিল্ডারদের জোরালো আবেদনে সাড়া দেন আম্পায়ারও। খালি চোখেই বোঝা যাচ্ছিল, বল আঘাত হানতো স্ট্যাম্পে। তাই আর রিভিউ নেয়নি পাকিস্তান।

যার ফলে শফিকের অভিষিক্ত ইনিংসের সমাপ্তি ঘটেছে ১৬৬ বলে ৫২ রান করে। যেখানে ছিল দুইটি করে চার-ছয়ের মার। শফিক ফিরতে পারতেন ব্যক্তিগত ৯ রানেই। তাইজুলের বলে ঠিক একইভাবে প্যাডে লেগেছিল শফিকের। কিন্তু আম্পায়ার আউট দেননি। বাংলাদেশও রিভিউ নেয়নি। ফলে বেঁচে যান শফিক।

ওপেনারের বিদায়ের পর তিন নম্বরে নেমেছিলেন অভিজ্ঞ আজহার আলি। তাকে প্রথম বলেই বোকা বানান তাইজুল। মিডল স্ট্যাম্পে পিচ করা ডেলিভারি ডিফেন্ড করলেও তার ব্যাট পেরিয়ে বল আঘাত হানে প্যাডে।

এবারও জোরালো আবেদন বাংলাদেশের ফিল্ডারদের। কিন্তু সাড়া দেননি আম্পায়ার। সঙ্গে সঙ্গে রিভিউ নেন বাংলাদেশ অধিনায়ক মুমিনুল হক। টিভি রিপ্লে দেখে আউটের সিদ্ধান্ত জানান থার্ড আম্পায়ার। শূন্য রানে সাজঘরে ফেরেন আজহার। চার নম্বরে নামেন অধিনায়ক বাবর।

ডানহাতি ওপেনার আবিদ আলির সঙ্গে শুরুর ধাক্কা সামাল দেওয়ার কাজটা বেশ ভালোভাবেই করছিলেন বাবর। আগেরদিনের মতোই সাবলীল ব্যাটিং করতে থাকেন আবিদ। বাংলাদেশের বোলারদের কোনো সুযোগই দেননি তিনি। দেখেশুনে খেলে ইনিংসের ৬৮তম ওভারে ক্যারিয়ারের চতুর্থ সেঞ্চুরি তুলে নেন আবিদ।

তবে আবিদকে বেশিক্ষণ সঙ্গ দেওয়া হয়নি বাবরের। পাকিস্তানের ইনিংসের ৭৩তম ওভারে আক্রমণে ছিলেন মিরাজ। দ্বিতীয় বলেই তাকে বাউন্ডারি হাঁকান বাবর, পৌঁছে যান ব্যক্তিগত ১০ রানে। তবে এক বল পর প্রতিশোধ নিয়ে নেন বাংলাদেশের অফস্পিনার। সরাসরি বোল্ড করে ১০ রানেই বাবরের বিদায়ঘণ্টা বাজান তিনি।

অফস্ট্যাম্পের বাইরে পিচ করা ডেলিভারিটি পেছনে পায়ে আলতো ডিফেন্স করতে চেয়েছিলেন বাবর। কিন্তু সেই বলটি টার্ন না করা সোজা চলে যায় বাবরের ব্যাটের বাইরের কানা দিয়ে, সোজা আঘাত হানে অফস্ট্যাম্পে। সরাসরি বোল্ড হয়ে সাজঘরে ফেরার আগে ৪৬ বলে ১০ রান করেছেন বাবর।

অধিনায়কের বিদায়ের পর ফাওয়াদও বেশি কিছু করতে পারেননি। একপ্রান্তে আবিদ নিখুঁত ও সাবলীল ব্যাটিং করতে থাকলেও ফাওয়াদের বিপক্ষে বারবারই প্রশ্ন তুলছিলেন বাংলাদেশের বোলাররা। শেষ পর্যন্ত তাইজুলের ঘূর্ণিতেই বাজে ফাওয়াদের বিদায়ঘণ্টা।

ইনিংসের ৭৮তম ওভারের তৃতীয় বলে তাইজুলের ঘূর্ণিতে পুরোপুরি পরাস্ত হন ফাওয়াদ। বেশ লম্বা বাঁক খাওয়া ডেলিভারিটি ফাওয়াদের গ্লাভস ছুঁয়ে প্যাডে লেগে উইকেটের পেছনে গেলে দুর্দান্ত ক্ষিপ্রতায় এক হাতে সেটি গ্লাভসবন্দী করেন উইকেটরক্ষক লিটন দাস।

বাংলাদেশের বোলার-ফিল্ডারদের জোরালো আবেদনের পরেও আউট দেননি আম্পায়ার। সঙ্গে সঙ্গে রিভিউ নেন বাংলাদেশ অধিনায়ক মুমিনুল হক। টিভি রিপ্লে দেখে ফাওয়াদকে কট বিহাইন্ড আউটের ঘোষণা দেন থার্ড আম্পায়ার। আউট হওয়ার আগে ফাওয়াদ করেছেন ১৫ বলে ৮ রান।

তাইজুলের আগের ওভারে লেগ বিফোরের জোরালো আবেদন হয়েছিল সেঞ্চুরিয়ান আবিদ আলির বিপক্ষেও। সেবারও আউট দেননি আম্পায়ার। পরে বাংলাদেশ রিভিউ নিলে দেখা যায় বলটি প্যাডে লাগার আগে আবিদের ব্যাটের ভেতরের কানা ছুঁয়ে গেছে। তাই বেঁচে যান পাকিস্তানি ওপেনার।

ফাওয়াদকে আউট করার পর ইনিংসের ৮০তম ওভারে আবিদের বিপক্ষে পরিষ্কার সুযোগ তৈরি করেছিলেন তাইজুল। তার হালকা বাঁক খাওয়া ডেলিভারি আবিদের ব্যাটের বাইরের কানা ছুঁয়ে চলে যায় প্রথম স্লিপে। কিন্তু সেটি তালুবন্দী করতে পারেননি নাজমুল হোসেন শান্ত। ফলে ১১৩ রানে জীবন পেয়ে যান আবিদ।

সেশনের বাকি সময়ে আর সুযোগ দেননি আবিদ ও নতুন ব্যাটার মোহাম্মদ রিজওয়ান। দুজন মিলে দেখেশুনে দলকে নিয়ে গেছেন মধ্যাহ্ন বিরতিতে।

প্রথম সেশনে চার উইকেট নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করেছিলেন দুই স্পিনার তাইজুল মিরাজ। দ্বিতীয় সেশনে ফিরে তাদের সঙ্গে যোগ দেন ডানহাতি পেসার এবাদত হোসেন চৌধুরী। সেশনের তৃতীয় ওভারেই সাজঘরে পাঠিয়ে দিয়েছেন মোহাম্মদ রিজওয়ানকে।

মধ্যাহ্ন বিরতি দেওয়ার আগের ওভারে নতুন বল নিয়েছিল বাংলাদেশ। এক ওভার করা নতুন বলে দ্বিতীয় সেশনের শুরু থেকেই দুই পেসারকে আক্রমণে আনেন মুমিনুল। সফলতাও পেয়েছেন হাতেনাতে। সেশনের তৃতীয় ওভারের প্রথম বলে রিজওয়ানকে লেগ বিফোরের ফাঁদে ফেলেছেন এবাদত।

অফস্ট্যাম্পের বাইরের ডেলিভারিটি গতির সঙ্গে ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল, পাশাপাশি খানিক নিচুও ছিল। যা রিজওয়ানের ডিফেন্স ভেদ করে আঘাত হানে প্যাডে। আউটের আঙুল তুলে দিতে দেরি করেননি আম্পায়ার। ফলে বিদায়ঘণ্টা বাজে ৩৮ বলে ৫ রান করা পাকিস্তানের উইকেটরক্ষক ব্যাটারের।

শুরু থেকেই বাংলাদেশের গলার কাঁটা হয়ে বিঁধে ছিলেন ডানহাতি ওপেনার আবিদ আলি। একবার ক্যাচের সুযোগ দিয়েও বেঁচে যান ব্যক্তিগত ১১৩ রানের মাথায়। বাংলাদেশের বোলারদের হতাশা বাড়িয়ে একাই পাকিস্তানের ইনিংস টেনে নিচ্ছিলেন এ ডানহাতি ওপেনার।

তাকে ফিরিয়ে বাংলাদেশ দলে স্বস্তি আনলেন বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম। দ্বিতীয় সেশনে প্রথমবারের মতো আক্রমণে এসে চতুর্থ বলেই আবিদকে লেগ বিফোরের ফাঁদে ফেলেছেন তাইজুল। যার ফলে ৬ উইকেট হারিয়ে ফেলেছে পাকিস্তান। বাংলাদেশের সামনে জাগে লিড নেওয়ার আশা।

তাইজুলের ওভারের দ্বিতীয় বলে সামনে এগিয়ে খেলতে গিয়েছিলেন আবিদ। কিন্তু ব্যাটের ভেতরের কানায় লেগে বল যাচ্ছিল স্কয়ার লেগের দিকে। দারুণ ক্ষিপ্রতায় সেটি নিজের আয়ত্বে নিয়েছিলেন শর্ট লেগে দাঁড়ানো ইয়াসির আলি রাব্বি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হাতে রাখতে পারেননি।

তবে এক বল পর ভেতরে ঢোকা ডেলিভারিতে পরাস্ত হন পাকিস্তানের সেঞ্চুরিয়ান। তাইজুলের জোরালো আবেদনে আউটের সিদ্ধান্ত জানান আম্পায়ার। রিভিউ নিয়েও নিজের উইকেট বাঁচাতে পারেননি আবিদ। সাজঘরে ফিরতে হয়েছে ১৩৩ রান করে। আউট হওয়ার আগে দলের সিংহভাগ রান একাই করেছেন তিনি।

আবিদকে আউট করার পর হাসান আলিকেও সাজঘরে পাঠান তাইজুল। তার করা ৯৬তম ওভারের প্রথম দুই বলে যথাক্রমে চার ও ছক্কা মারেন হাসান। একই ধারাবাহিকতায় তৃতীয় বলেও বাউন্ডারির আশায় এগিয়ে মারতে যান তিনি। কিন্তু মিস করেন সেই টার্ন ও বাউন্স করা ডেলিভারি।

উইকেটের পেছনে কোনো ভুল করেননি লিটন। সঙ্গে সঙ্গে স্ট্যাম্প ভেঙে দিয়ে প্যাভিলিয়নের ঠিকানা ধরিয়ে দেন হাসানের হাতে। আর পূরণ হয় তাইজুলের ফাইফার। যা তার ক্যারিয়ারের নবমবারের মতো পাঁচ উইকেট নেওয়ার ঘটনা। বাংলাদেশি বোলারদের মধ্যে ফাইফারের তালিকায় তিনি এককভাবে উঠে যান দুই নম্বরে।

২৪০ রানে ৮ উইকেট হারানোর পর শেষ দুই উইকেটে মূল্যবান ৪৬ রান পেয়ে যায় পাকিস্তান। দলীয় ২৫৭ রানের মাথায় নৌমান আলিকে লেগ বিফোরের ফাঁদে ফেলেন তাইজুল। আম্পায়ার আউট দেওয়ার পর রিভিউ নিয়েছিলেন নৌমান। মনে হচ্ছিল, একইসঙ্গে ব্যাট ও প্যাডে লেগেছে বল। কিন্তু পরিষ্কার প্রমাণ না থাকায় সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেননি থার্ড আম্পায়ার।

এরপর দশম উইকেট জুটিতে বাংলাদেশের বোলারদের হতাশায় ডোবান শাহীন শাহ আফ্রিদি ও ফাহিম আশরাফ। দুজন মিলে গড়েন ২৯ রানের জুটি। শেষপর্যন্ত নাটকীয় এক ক্যাচে ফাহিমের ইনিংসের সমাপ্তি ঘটান লিটন। লেগস্ট্যাম্পের বাইরের বলে সুইপ করেছিলেন ফাহিম।

সেটি তার ব্যাটের কানায় লাগার পর ক্যাচ ধরতে গিয়েছিলেন লিটন। কিন্তু গ্লাভসে জমা না পড়ে বল আটকে যায় দুই পায়ের ফাঁকে। এতেই শেষ হয় পাকিস্তানের ইনিংস। ফাহিমের ব্যাট থেকে আসে ৮০ বলে ৩৮ রান। শাহিন অপরাজিত থাকেন ৩২ বলে ১৩ রান করে।

বল হাতে ১১৬ রানে ৭ উইকেট নিয়েছেন তাইজুল। যা তার ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় সেরা বোলিংয়ের রেকর্ড। এছাড়া এবাদত দুইটি ও মিরাজ নিয়েছেন এক উইকেট।